শ্রীলঙ্কায় ইস্টার সানডে উদ্যাপনের সময় তিনটি গির্জা ও তিনটি হোটেলে বোমা হামলায় নিহত ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে ২০৭ হয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৩৫ জন বিদেশি। এএফপির খবরে পুলিশ এ তথ্য জানিয়েছে। হাসপাতাল ও পুলিশের বরাত দিয়ে রয়টার্স বলছে, ঘটনায় আহত ব্যক্তির সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়েছে। এছাড়া নিখোঁজ রয়েছেন বেশ কিছু লোক, যাদের মধ্যে দুই বাংলাদেশিও আছেন। হতাহতের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে কর্তৃপক্ষ।

রোববার (২১ এপ্রিল) সকালে ইস্টার সানডের আয়োজন ঘিরে রাজধানী কলম্বো ও তার পাশের তিনটি গির্জা ও তিনটি হোটেলে এই বিস্ফোরণ ঘটে। দেশটির পুলিশ এই তথ্য জানিয়েছে।

সকালে রাজধানী কলম্বো ও এর আশপাশের তিন গির্জা এবং অভিজাত হোটেলে হামলা চালানো হয়। কয়েকঘণ্টা পর হামলা হয় দেহিওয়ালা জেলার একটি হোটেলে এবং দেমাতাগোদা জেলার একটি স্থাপনায়। বেশিরভাগ হামলা চালানো হয় আত্মঘাতী বোমা ফাটিয়ে। হামলার পর ঘটনাস্থলে পড়েছিল মানুষের লাশ। রক্তের ছোপ পড়েছিল গির্জা-হোটেলের মেঝেতে।

শ্রীলঙ্কান সংবাদমাধ্যম বলছে, রোববার খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের বড় ধর্মীয় উৎসব ইস্টার সানডে উদযাপন করা হচ্ছিলো গির্জাগুলোতে। এর মধ্যেই সকাল সাড়ে ৮টার দিকে কলম্বোর সেন্ট অ্যান্থনি গির্জায় বোমা হামলা হয়। আধঘণ্টার মধ্যেই হামলা হয় কলম্বোর ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সেন্ট সেবাস্টিন গির্জা ও ২৫০ কিলোমিটার দূরে বাট্টিকালোয়ার জিওন গির্জায়। প্রার্থনালয়গুলো যখন কাঁপছিল, সমানে হামলা হতে থাকে কলম্বোর অভিজাত কিংসবারি, সাংগ্রিলা এবং সিনামোন গ্র্যান্ড হোটেলে। এই হোটেলগুলোতে তখন বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিক ছিলেন।

গোটা কলম্বোবাসী ঘটনার আকস্মিকতা কাটিয়ে না উঠতেই দেহিওয়ালা জেলার ওই হোটেলে এবং দেমাতাগোদা জেলার একটি স্থাপনায় ফের হামলা হয়।

সংশ্লিষ্ট স্থানগুলোর প্রশাসনের বরাত দিয়ে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বলছে, দফায় দফায় হামলায় এ পর্যন্ত ২০৭ জন নিহত হয়েছেন। হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে আরও পাঁচ শতাধিক মানুষকে। খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে নিখোঁজ মানুষগুলোর।

সেন্ট সেবাস্টিন গির্জা কর্তৃপক্ষ হামলার পরের কয়েকটি ছবি প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা যায়, বোমা বিস্ফোরণে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে গির্জার ভেতরের জায়গা। মেঝেতে চোখে পড়ছে রক্তের ছোপ।

বিচ্ছিন্নতাবাদী তামিল টাইগারদের দমনের পর অনেকটা শান্তির জনপদ হয়ে ওঠা শ্রীলঙ্কা এই বোমা বিস্ফোরণে যেন স্তম্ভিত হয়ে পড়েছে। তবে দেশটির প্রেসিডেন্ট মৈথ্রিপালা সিরিসেনা এ বিষয়ে সবাইকে ধৈর্য ধরে পরিস্থিতি মোকাবিলার আহ্বান জানিয়েছেন।ঘটনাস্থল থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে এক বুদ্ধাকেনিহত ৩৫ বিদেশি, নিখোঁজ দুই বাংলাদেশিও

শ্রীলঙ্কান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রের বরাত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে ৩৫ জন বিদেশি রয়েছেন। এদের মধ্যে আমেরিকান, ব্রিটিশ এবং ডাচ নাগরিক রয়েছেন। আহতদের মধ্যেও শতাধিক বিদেশি রয়েছেন। উভয় সংখ্যাই বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

হতাহতদের মধ্যে কোনো বাংলাদেশি আছেন কি-না, তা নিশ্চিত করে বলা না গেলেও ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম বলেন, বোমা হামলার ঘটনাটির পর এখন পর্যন্ত দুজন বাংলাদেশি আনঅ্যাকাউন্টেড ফর ( খোঁজ মিলছে না)। আমরা জেনেছি একটি পরিবারের চারজনের মধ্যে দুজন রিপোর্টেড (তাদের খোঁজ আছে)। বাকি দুইজনের একজন শিশু ও একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি আনঅ্যাকাউন্টেড ফর। তবে তাদের নাম-পরিচয় এখনো কিছুই জানা যায়নি। আমরা আশা করছি তাদের কোনো হোটেল বা হাসপাতালে রাখা হয়েছে। আমরা জানতে পারলেই জানিয়ে দেওয়া হবে।

ঘটনার পর এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট মৈথিপালা সিরিসেনা জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, তিন বাহিনী ছাড়াও পুলিশ এবং বিশেষায়িত ফোর্সকে ঘটনার দ্রুত তদন্ত করে জড়িতদের বের করতে বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে জনগণের সহযোগিতা আহ্বান করা হচ্ছে।

তৎক্ষণাৎ জরুরি বৈঠক ডাকেন প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রম সিংহে। এতে যোগ দেন নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান, মন্ত্রী ও উপদেষ্টারা।হামলার পর ঘটনাস্থলের চিত্রদেশজুড়ে কারফিউ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কড়াকড়ি

দেশজুড়ে কারফিউ জারি: নিরাপত্তা জোরদার এবং পরিস্থিতি মোকাবেলায় দুপুরের পরই কারফিউর ঘোষণা দেয় শ্রীলঙ্কার সরকার। ঘোষণায় বলা হয়, রোববার সন্ধ্যা ৬টা থেকে পরদিন ভোর ৬টা পর্যন্ত ১২ ঘণ্টা কারফিউ জারি থাকবে। এছাড়া, নিরাপত্তার স্বার্থে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ সব রুটে প্লেন চলাচল স্থগিত করেছে কর্তৃপক্ষ।

অন্যদিকে এই মুহূর্তে গুজব ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে দেশটিতে ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপসহ কিছু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্লক করে দেওয়া হয়েছে। গতি কমিয়ে দেওয়া হয়েছে ইন্টারনেটেরও।

আগেই সতর্ক করেছিলো পুলিশ: সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, আত্মঘাতী হামলাকারীরা গুরুত্বপূর্ণ গির্জায় হামলা চালাতে পারে বলে দিন দশেক আগে সংশ্লিষ্ট দফতরে সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন পুলিশ প্রধান পিয়ুথ জয়াসুন্দর। তিনি ওই বার্তায় বলেছিলেন, উগ্রবাদী সংগঠন ন্যাশনাল তৌহিদ জামাত (এনটিজে) শ্রীলঙ্কার গুরুত্বপূর্ণ গির্জা, এমনকি কলম্বোয় ভারতীয় হাইকমিশনেও আত্মঘাতী হামলার পরিকল্পনা করছে। গত বছর দেশটিতে বুদ্ধ মূর্তি ভাঙার ঘটনার মধ্য দিয়ে অস্তিত্ব জানান দেয় উগ্রবাদী সংগঠনটি।

তবে রোববারের হামলার সঙ্গে তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি-না, সে বিষয়ে কোনো তথ্য জানাতে পারেনি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

আটক ৭ সন্দেহভাজন: শ্রীলঙ্কার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে বিবিসি জানিয়েছে, এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত সাত সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে। বিস্ফোরণগুলোর বেশিরভাগই একটি গোষ্ঠী আত্মঘাতী কায়দায় ঘটিয়েছে। ওই গোষ্ঠীটিরই সদস্য হিসেবে তাদের ধরা হয়েছে।
হামলার পর একটি গির্জার ভেতরের চিত্রস্তম্ভিত শ্রীলঙ্কাবাসী

শ্রীলঙ্কায় বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে নির্বিচারে হামলা চালাতো তামিল গেরিলারা। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ‘তামিল ইলাম’ নামে আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৮৩ সাল থেকে সশস্ত্র বিদ্রোহ চালিয়ে আসা এই গেরিলাদের প্রধান ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণকে ২০০৯ সালে হত্যার মধ্য দিয়ে তাদের দমন করা হয়।

প্রায় এক দশক পরে এমন বর্বর কায়দায় হামলা দুঃস্বপ্নের মতো সামনে এসে দাঁড়িয়েছে শ্রীলঙ্কাবাসীর। তারা বলছেন, তারা ভেবেছেন সহিংসতা হয়তো শ্রীলঙ্কায় অতীত হয়েছে। কিন্তু এই ট্র্যাজেডি তাদের বিমর্ষ করে দিয়েছে।

৪৮ বছর বয়সী চিকিৎসক এমানুয়েল বলেন, সিনামোন গ্র্যান্ড হোটেলে যখন একটি বোমা বিস্ফোরণ হয়, তখন আমি আমার স্ত্রী-সন্তানসহ ওই হোটেলের কক্ষেই অবস্থান করছিলাম। সাড়ে ৮টার দিকে এই বিস্ফোরণে ভয় পেয়ে আমরা হোটেল লাউঞ্জে দৌঁড়ে যাই। তখন আমাদের সেখান থেকে সরে যেতে বলা হয়। দেখলাম, সামনে দিয়ে রক্তাক্ত মানুষদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, সিংহলিজ ও তামিল জনগোষ্ঠীর জাতিসত বিভাজনের কারণে শ্রীলঙ্কা দশকের পর দশক ধরে জ্বলেছে। কিন্তু ২০০৯ সালের পর আমরা অপেক্ষাকৃত শান্তিতেই ছিলাম। সেজন্য আমরা ভেবেছিলাম যে, সংঘাত-সহিংসতা অতীত হয়েছে। কিন্তু এসব ফিরতে দেখে খুব খারাপ লাগছে।

বিশ্বনেতাদের নিন্দা: বর্বরোচিত এ হামলার নিন্দা জানিয়েছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নিন্দা করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানও। একইসঙ্গে নিন্দা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী টেরিজা মে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, জার্মানির চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মেরকেল, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজসহ নেদারল্যান্ড, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশ ও জোটের প্রধানরা।