গাজীপুরে গত ৯ বছরে ৬৭০ জন শিশুকে ক্লাবফুট বা মুগুর পায়ের চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে। ঢাকাস্থ অস্ট্রেলিয়ান দূতাবাসের সহযোগিতায় দি গ্লেনকো ফাউন্ডেশনের ওয়াক ফর লাইফ প্রজেক্টের মাধ্যমে এসব শিশুদেরকে বিনামূল্যে এ চিকিৎসা প্রদান করা হয়। ফলে জন্মগতভাবে পায়ের পাতা বাকা রোগে আক্রান্ত (মুগুর পা) এসব শিশু জীবনব্যাপী প্রতিবন্ধিত্বের হাত থেকে রক্ষা পেল। গাজীপুরস্থিত শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অর্থোপেডিক সার্জারী ডিপার্টমেন্ট শিশুদের এ রোগের চিকিৎসায় সহযোগিতা করে আসছে। এ হাসপাতালের একটি কক্ষ বরাদ্দ নিয়ে ২০১০ সাল থেকে অর্থোপেডিকস সার্জারী বিভাগের চিকিৎসক ডাঃ ওয়াকিল আহমেদের তত্ত্বাবধানে প্রতি বুধবার বিনামূল্যে ৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের মুগুর পায়ের চিকিৎসা প্রদান করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৬৭০ জন শিশুকে চিকিৎসা প্রদান করে তাদেরকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

বুধবার বিশ্ব ক্লাবফুট দিবস পালন উপলক্ষ্যে আয়োজিত র‌্যালীপূর্ব অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানান ক্লিনিকটির ব্যবস্থাপক ও পনসেটি চিকিৎসক ডাঃ মোঃ জামিল হোসেন। শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডাঃ তপন কান্তি সরকার প্রধান অতিথি হিসেবে এ র‌্যালিতে বক্তব্য রাখেন। এসময় শহীদ তাজ উদ্দিন আহমেদ মেডিক্যাল কলেজের সহকারী পরিচালক ডাঃ খাইরুল ইসলাম, অর্থোপেডিকস সার্জন ডাঃ ওয়াকিল আহমেদ, ডাঃ আনিসুজ্জামান প্রমূখ উপস্থিত ছিলেন।

চিকিৎসা কেন্দ্রটির ব্যবস্থাপক ও পনসেটি চিকিৎসক ডাঃ মোঃ জামিল হোসেন জানান, প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ৫ হাজার শিশু ক্লাবফুট বা মুগুর পা নিয়ে জন্মায়, যার ফলে জন্মগতভাবেই শিশুর পা বাঁকা থাকে। চিকিৎসা না করালে মুগুর পা জীবনব্যাপী প্রতিবন্ধিত্ব সৃষ্টি করে। পনসেটি নামক জনৈক অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক এ রোগের চিকিৎসার জন্য একটি পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন, যা পনসেটি মেথড নামে পরিচিত। এ মেথডের মাধ্যমে এ রোগটির সহজ, সরল, সূলভ ও স্থায়ী চিকিৎসা সম্ভব। বাংলাদেশে বেসরকারী সংস্থা দি গ্লেনকো ফাউন্ডেশন পরিচালিত ওয়াক ফর লাইফ প্রকল্প বিনামূল্যে এ চিকিৎসা সেবা দিচ্ছে।

তিনি আরো জানান, ওয়াক ফর লাইফ প্রকল্পটি ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যশোর জেলা সদর হাসপাতাল থেকে পরীক্ষামূলকভাবে কার্যক্রম শুরু করে। এ কার্যক্রম সফল হলে গত ৯ বছর ধরে দেশব্যাপী ৩৩টি জেলায় সরকারী ও বেসরকারী হাসপাতালে অবস্থিত কেন্দ্রের মাধ্যমে এ কার্যক্রমের দ্বারা প্রায় ২৪ হাজার ৬শ’ শিশুর পায়ের পাতার চিকিৎসা করা হয়েছে।

ডাঃ মোঃ জামিল হোসেন জানান, ক্লাবফুট জন্মগত একটি রোগ হলেও সময়মত চিকিৎসার মাধ্যমে এ রোগটি সারিয়ে তোলা যায়। এ রোগে আক্রান্ত প্রায় শতকরা ৯৫ ভাগ শিশু চিকিৎসার মাধ্যমে ভাল হয়েছে। জন্মের পর পরই চিকিৎসা করালে মাত্র ৩ মাসেই এ রোগটি ভাল হবার কথা। তারপরও ৫ বছর পর্যন্ত শিশুকে পর্যবেক্ষনে রাখা হয়। তিনি জানান, গ্রামীন নানা কুসংস্কারের কারনে অনেকেই এ রোগে আক্রান্ত শিশুদেরকে সঠিক চিকিৎসা করান না। ফলে বড় হয়ে এসব শিশুরা প্রতিবন্ধিত্ব হয়ে সমাজের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তাই সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও সঠিক সময়ে চিকিৎসা প্রদান করা জরুরী।

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের বোর্ডবাজার এলাকার বাসিন্দা রীনা বেগম জানান, তার মেয়ে মরিয়মের দুই পায়েই এ রোগ ছিল। তিনি সন্তানের তিন মাস বয়স থেকে গাজীপুরের এ কেন্দ্রে এসে প্রতি বুধবার চিকিৎসা করানোর ফলে এখন তার মেয়ে সম্পূর্ন ভাল হয়ে গিয়েছে। কোনাবাড়ী এলাকার গার্মেন্টসকর্মী মিন্টু মিয়া তার সাড়ে তিন বছরের মেয়ে মুনকে নিয়ে এসেছেন। তিনি জানান, সন্তানের তিন মাস বয়স থেকে চিকিৎসা করাচ্ছেন তিনি। এখন ৯০ ভাগ সুস্থ্য হয়ে উঠেছে। আগে তার মেয়ে দৌড়াতে পারতো না, এখন দৌড়াতে পারে। এ রোগ থেকে তার মেয়ে সম্পূর্ন ভাল হবে বলে তার আশা। গাইবান্ধা জেলার বাসিন্দা ফারুক থাকেন গাজীপুরে। তার সাড়ে চার বছর বয়সের ছেলে আদিবের জন্ম থেকেই ডান পা বাকা ছিল। এখানে চিকিৎসা করানোর ফলে এখন সে হাটতে পারে ও দৌড়াতে পারে। শুধু রীনা, মিন্টু বা ফারুক নয়, তাদের মত আরো শতাধিক অভিভাবক হাজির হয়েছিল তাদের বাচ্চাদের নিয়ে র‌্যালিতে অংশ নিতে। সবাই এখানকার চিকিৎসায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ এন্ড হাসপাতালের উপ পরিচালক ডাঃ তপন কান্তি সরকার বলেন, এ রোগটি সম্পর্কে অনেকের ভুল ধারনা রয়েছে। কিন্ত চিকিৎসার মাধ্যমে এ রোগ থেকে শিশুদেরকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে নিয়ে আসাা যায়। সারা দেশের ন্যায় আমাদের এখানেও প্রতি বুধবার বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদান করা হয়। এটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি জ্বলন্ত উদাহরন।