নির্বাচন এলেই শুনি বাঁশের সাঁকোর পরিবর্তে আমাগো পাকা সেতু করে দিবেন চেয়ারম্যান-মেম্বাররা। কিন্তু পঞ্চাশ বছর ধরে একই প্রতিশ্রুতি শুনে আসছি কিন্তু আজ পর্যন্ত সেতুর মুখ দেখলাম না। আমাগো গ্রামের যুবকরা মিলে প্রতি তিন-চার মাস পর পর এলাকার সবার কাছ থেকে কিছু চাঁদা তুলে এই বাঁশের সাঁকোটিই সংস্কার করে। কবে যে আমাদের দুর্ভোগ কমবে, কবে যে পাকা সেতু দিয়ে পারাপার হবো? সেই আসা কি কোন দিন পুরন হবে কি না যানি না। তবে আমি বেঁচে থাকতে নিজের চোখে এখানে সেতু দেখে যেতে পারলে মারলেও শান্তি পেতাম। আমাদের দীর্ঘ দিনের এ স্বপ্ন কি কোন দিন বাস্তবায়ন হবেন। এ কথাগুলো ভিষন আক্ষেপ করে বলেছেন মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার প্রত্যন্তঞ্চল সূর্যমনি এলাকার ৬০ বছরের বৃদ্ধ মোঃ ওহাব আলী হাওলাদার।

উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের সূর্যমনি বাজারের পাশে আড়িয়াল খাঁ নদের শাখা কাঁচিকাটা খালের ওপর পাকা সেতু না থাকায় দীর্ঘদিন যাবৎ সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছে ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের বাসিন্দারা। প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো দিয়ে পারাপার হচ্ছে এলাকাবাসী। স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরাও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই সাঁকো দিয়ে স্কুলে আসা যাওয়া করছেন। সাঁকো থেকে পা পিছলে নিচে পড়ে প্রায়ই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। স্থানীয় সূত্রে জানাযায়, লক্ষ্মীপুর ইউনিয়ন পরিষদের পাশেই সূর্যমনি বাজার। এই সূর্যমনি বাজার থেকে রায়পুর ও ভাটবালী গ্রামে যেতে হলে পাড়ি দিতে হয় বিশাল একটি বাঁশের সাঁকো। সাঁকোর ওই পাড়ে ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ড। প্রতিনিয়ত ৮নং ওয়ার্ডের ১০টি গ্রামের অন্তত চার হাজার মানুষ এই সাঁকো দিয়ে যাতায়াত করেন। সাঁকোটি সংস্কারের জন্য স্থানীয়দের কাছ থেকে চাঁদা তুলে তিন থেকে চার মাস পরপরে সাঁকোটি সংস্কার করেন স্থানীয়রা যুবকরা। আবার অনেক সময় এ চাঁদা তুলতে ব্যর্থ হলে সাঁকোটি ভাঙ্গা অবস্থায় পরে থাকে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কাঁচিকাটা এই খালটি দিয়ে নৌকা ও ট্রালার চলাচল করে। খালটি সরাসরি আড়িয়াল খা নদের সাথে যুক্ত হয়েছে। সূর্যমনি বাজার থেকে ৮নং ওয়ার্ডের রায়পুর, ভাটবালী, চরলক্ষ্মী ও চরজোমহ ও বাশগাড়ি সহ প্রায় ১০টি গ্রামের মানুষ এই সাঁকো দিয়ে দৈনিক যাতায়াত করেন। বাঁশের তৈরি সাঁকোটি প্রায় দেড়শ মিটার লম্বা। সাঁকোটি নড়বড়ে থাকায় অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে পথচারীদের। দৈনিক এই সাঁকোটি দিয়ে চলাচলকারী রায়পুর এলাকার বাসিন্দা খাইরুল আলম বলেন, ‘সেতুর বদলে সাঁকো থাকায় আমাদের প্রতিদিন পায়ে হেটে চলাচল করতে হয়। বিশেষ করে বৃষ্টি নামলে বাঁশের সাঁকোটি দিয়ে চলাচল বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাড়ায়। আমরা অনেকটা সাবধাণে পাড় হলেও ছোটরা এই সাঁকো পাড় হতে গিয়ে প্রায় দুর্ঘটনার শিকার হয়।

চরলক্ষ্মী এলাকার কলেজছাত্র সলেমান কাজী বলেন, ‘জন্মের পর থেকেই এই বাঁশের সাঁকো দিয়ে পাড়াপাড় হতে হচ্ছে। রোজ পায়ে হেটে কলেজে, প্রাইভেটে যাই। সাঁকোটি পরিবর্তে একটি পাকা সেতু হলে আমাদের অনেক উপকার হতো। বাড়ির সামনে গাড়ি যেত, চলাচলে অনেক সুবিধা হতো, সময় বাচতো। সরকারের কাছে আমাদের গ্রামবাসীর সকলের দাবি বাঁেশর সাঁকোর পরিবর্তে আমাদের এখানে একটি পাকা সেতু নির্মান করে যেন দেন।

সূর্যমনি বাজারের ব্যবসায়ী আব্দুল্লাহ্ আল তুহিন বলেন, ‘বছর বছর জনপ্রতিনিধিরা সাঁকো বদলে সেতু নির্মানের যে প্রতিশ্রুতি দেয় তা আর পূরণ হয় না। আমাদের একটাই দাবি এখানে একটি সেতু করে দেয়া হোক। সেতু হলে আমাদের এলাকায় ব্যবসা বানিজ্যের সুবিধা হত। লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তোফাজ্জেল হোসেন বলেন, ‘সাঁকোটি ভেঙে পাকা সেতু নির্মান এখন সময়ের দাবি হয়ে দাড়িয়েছে। মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টি আমরা স্থানীয় সরকার বিভাগের কাছে জানিয়েছি। তারা এখানে এসে মাটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেও গেছেন। আশা করছি এই বছরের শেষ হওয়ার আগেই টেন্ডার হবে। সেতুটি নির্মান হলে এই এলাকার পিছিয়ে পড়া মানুষের অনেক উন্নতি ঘটবে।

এব্যাপারে স্থানীয় সরকার অধিদপ্তর মাদারীপুর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী বাবুল আখতার জানান, সূর্যমনি এলাকায় কাঁচিকাটা খালের ওপর যেই সাঁকোটি আছে ওটার পরিবর্তে পাকা সেতু নির্মান করার প্রস্তাব মন্ত্রনালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন হয়ে এলেই টেন্ডার দিয়ে দ্রুত কাজ শুরু হবে।

সাবরীন জেরীন,মাদারীপুর।