কেউ সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মায় না। এ দেশের অনেক নারী-পুরুষ প্রমাণ করে দেখিয়েছেন সফল হতে তেমন কিছু লাগে না। লাগে কেবল মেধা, গুণ, নিষ্ঠা আর শ্রম। এগুলো আঁকড়ে ধরে থাকলেই সাফল্য একদিন আসবেই। এমন চিন্তা-চেতণা আর মনোবল নিয়ে এগিয়ে চলা ক্ষুদ্র শিল্প উদ্যোক্তা অদম্য এক নারী অনুজা সাহা। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার কারনে কখনো কখনো ব্যর্থতা-হতাশা এমন ভাবে তাকে ঘিরে ধরেছেন, তার কাছে মনে হয়েছে আর এগোনো হয়তোবা সম্ভব হবে না, তবুও তিনি হাল ছাড়েননি, দমে যাননি নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি আজ সাবলম্বী নারী। তিনি নিজেই স্বনির্ভর হননি-প্রায় ২শ’ নারী কর্মস্থানের সুযোগ তেরী করে দিয়েছেন।

পাবনা শহরের গোপালপুর মহল্লার অমূল্য কুমার সাহা ও অঞ্জনা সাহার একমাত্র সন্তান অনুজা সাহা। শহরের এতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সেলিম নাজির উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক (অবঃ) শহরবাসীর শ্রদ্ধাভাজন অমূল্য সাহা ও তাঁর সুদক্ষ গৃহিনী অঞ্জনা সাহার অনেক স্বপ্ন ছিলো তাদের একমাত্র কন্যা সন্তান অনুজা’কে ঘিরে। স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে সরকারী এডওয়ার্ড কলেজ থেকে অর্থনীতিতে এমএসসি পাশ করান মেয়েকে। মানুষ গড়ার কারিগর অমূল্য সাহা’র বহু প্রিয় ছাত্র দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পর্যায়ে চাকুরী করলেও অনেক চেষ্টা তদবির করে নিজের মেয়ের জন্য একটি সরকারী বা বেসরকারী চাকুরী জোগাড় করতে পারেননি তিনি। মনোকষ্ঠ নিয়ে ৭৭ বছর বয়সী বৃদ্ধ শিক্ষক অমূল্য সাহা এখনো প্রাইভেট পড়িয়ে সংসার জীবনে যুদ্ধ করে চলেছেন। আলাপ চারিতায় অনুজা সাহা বলেন, ১৯৯০ সালের ১ জানুয়ারী আমার জন্ম। বাবার মুখে শুনেছি ৩ বছর বয়স থেকে নৃত্য এবং পরে সঙ্গীত চর্চা তার শুরু হয়। ধীরে ধীরে বড় হওয়ার পর থেকে নানা অনুষ্ঠান আর প্রতিযোগীতায় অংশ গ্রহন করে পুরস্কার ও সনদ অর্জন করেন তিনি। এইচএসসি পাশ করার পর আকস্মিক ভাবে তার বিয়ে হয়। দাম্পত্য জীবণে তাদের কোল জুড়ে একটি ছেলে সন্তান জন্ম নেয়। নাম রাখা হয় অর্ণব। ছেলের বয়স এখন ৬ বছর। স্বামীর ব্যবসায়িক অবস্থা খারাপ হয়ে যাওয়ায় অর্থনৈতিক সংকটে সংসার জীবণে দিশেহারা হয়ে পড়েন অনুজা সাহা। এমএসসি পাশ করে বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে থাকেন চাকুরীর জন্য অনুজা সাহা। কোথায়ও কোন কর্মের সংস্থান হয় না। পত্র-পত্রিকায় দেশের বিভিন্নস্থানের নারী উদ্যোক্তার গল্প পড়ে উদ্ধুদ্ধ হন অনুজা সাহা। চাকুরীর আশা ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা শুরু করার পরিকল্পনা নেন। অনুজা’র মা অঞ্জনা সাহা মেয়ের ব্যবসা করার ব্যাপারে অনাগ্রহী ছিলেন। সংসার জীবনের নির্মম বাস্তবতার কষাঘাতে মেয়ে যখন জর্জরিত মা তখন সম্ম¥তি দেন ব্যবসা করার। অনুজা সাহার মা ছিলেন সুদক্ষ একজন রাধুঁনী। সিদ্ধান্ত নেন খাবারের ব্যবসা করার। মায়ের সহযোগীতায় স্বল্প পুঁজি নিয়ে ক্ষুদ্র পরিসরে খাবারের হোম ডেলিভারী সার্ভিস চালু করেন তিনি। প্রতিষ্ঠানের না দেওয়া হয় অর্ণব এন্ড কোং। হোম ডেলিভারী সার্ভিস থেকে নানা ধরনের পিঠা, কেক, মিষ্টি, বেকারী আইটেম, সাদা ভাত, বিরানী সরবরাহ শুরু হয় পাবনার নানা স্থানে। বিভিন্ন স্থানের বড় বড় অর্ডার পেতে শুরু করে অর্ণব এন্ড কোং। ধীরে ধীরে এ ব্যবসার প্রসার ঘটতে থাকে। পুঁজির পরিমাণও বেড়ে যায়। এখানেই অনুজা থেমে নেই। বিসিক থেকে ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা প্রশিক্ষন নেন। মায়ের কাছ থেকে সেলাই ও কাটিং এর কাজ শেখেন তিনি। সেটা কাজে লাগাতে শুরু করেন। প্রশিক্ষন নেন যুব উন্নয়নের। পাশাপাশি শুরু করেন বুটিক হাউস ব্যবসা। সেটাও আলোর মুখ দেখতে থাকে। ছোটবেলা থেকেই নৃত্য ও সঙ্গীত চর্চায় পারদর্শী অনুজা গড়ে তোলেন ‘মন ময়ূরী’ নামের আরেকটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। এখানে আর্ট, নৃত্য, সঙ্গীত, আবৃত্তি, হাতের লেখা শেখানো হয় কোমলমতি শিশুদের। অনুজা জানায়, তার খাবারের প্রতিষ্ঠানে ২৫ জন ও বুটিক হাউজে ১৫০ জন শ্রমিক কাজ করছে। আজ তিনিই শুধু সাবলম্বী হননি, প্রায় ২শ’ দরিদ্র নারীর কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা করতে পেরে আমি খুবই আনন্দিত। কথা হয় তার প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত আলপনা, পূর্নিমা, অমলা, কৃষ্ণা, পারভিন, রেখা, লায়লা, রেহেনা, জলি, সিঁথি, তৃপ্তি, স্মৃতি ও রূপাসহ অনেকের সাথে। তারা বলেন, অভাব অনটনে অনেক কষ্টে, সৃষ্টে আমরা ছেলে-মেয়ে নিয়ে সংসার জীবণ কাটাতাম। সংসারের কাজের পাশাপাশি আমরা এই প্রতিষ্ঠানের কাজ করে অনেকটাই স্বচ্ছলতার মুখ দেখছি আজ। দরিদ্রতা অনেক কমা গেছে। স্বামীর মুখে দিকে খুব একটা তাকিয়ে থাকতে হয় না।

অনুজা বলেন, সমাজ ব্যবস্থার কারনে নারীরা এখনো অনেক পিছিয়ে আছে। মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। আমার সাধ্যমত দরিদ্র নারীদের সহায়তাসহ সমাজের উন্নয়নে কাজ করতে চাই। তবে সরকারী ভাবে আর্থিক সহযোগীতা পেলে আমার বিশ্বাস আরো এগিয়ে যেতে পারবো আমি। একই সাথে অন্যসব নারীদের অভাব অনটন ঘুচিয়ে স্বনির্ভর করে তুলতে পারবো।