গাজীপুরের মাল্টিফ্যাবস পোশাক কারখানার মুসলিম কর্মকর্তাদের মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় বাধ্যতামূলক করে আদেশ জারী করেছে কর্তৃপক্ষ। আদেশ অমান্যকারীদের বেতনের টাকা কেটে নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হলেও সোমবার বিকেলে বেতন কর্তনের ঘোষণা প্রত্যাহার করা হয়েছে। মসজিদে না গিয়ে ডেস্কে নামাজ পড়ার অভ্যাস পরিবর্তন ও নিজেদের মাঝে সৌহার্দ্য সম্পর্ক সৃষ্টি করতে মসজিদে নামাজ পড়ার বাধ্যতামূলকের এ নির্দেশনা দেয়া হয় বলে কারখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

গাজীপুর সিটি কর্পোরশনের কোনাবাড়ি কাশিমপুর এলাকাস্থিত মাল্টিফ্যাবস লিমিটেড কারখানার মানবসম্পদ ও প্রশাসন বিভাগের সহকারী মহা-ব্যবস্থাপক (এজিএম) অ্যাডভোকেট আবু শিহাব স্বাক্ষরিত ৯ ফেব্রুয়ারির এক বিজ্ঞপ্তিতে মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায়ের ওই অফিস নির্দেশনা জারি করা হয়। এতে বলা হয়েছে, অফিস চলাকালীন সময়ে মুসলিম কর্মকর্তাদের মসজিদে গিয়ে যোহর, আসর ও মাগরিব এই তিন ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে হবে। নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় কারখানার পাঞ্চ মেশিনে ফিঙ্গার পাঞ্চ করতে হবে। যদি কোনো স্টাফ মাসে সাত ওয়াক্ত পাঞ্চ করে নামাজ না পড়েন তবে সেক্ষেত্রে তার বেতন হতে একদিনের সমপরিমাণ হাজিরা কাটা হবে।

এদিকে সোমবার বিকেলে কারখানার নির্বাহী পরিচালক আব্দুল কুদ্দুস স্বাক্ষরিত অপর এক সংশোধনী বিজ্ঞপ্তি জারী করা হয়েছে। এতে দুঃখ প্রকাশ করে বলা হয়েছে শুধুমাত্র নামাজে উৎসাহ ও উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য কারখানার সকল সেকশনের বিভাগীয় প্রধান, ব্যবস্থাপক/সহকারি ব্যবস্থাপকদের উদ্দেশ্যে গত ৯ ফেব্রুয়ারি ওই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। তবে বেতন কর্তনের কোন উদ্দেশ্য নেই। ভুলবশতঃ বেতন কর্তনের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি সাংবাদিকদের জানান, এখন থেকে কর্মকর্তাগণ যেখানে খুশি নামাজ আদায় করতে পারবেন। এতে কোন বাধ্যকতা নেই।

কারখানার মানবসম্পদ বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক এনামুল করিম জানান, এ নির্দেশনা কেবলমাত্র ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাদের (মুসলিম) জন্য প্রযোজ্য হবে। কারখানার চার তলায় নামাজের জন্য নির্দিষ্ট কক্ষ রয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারী-শ্রমিক সবাই সেখানে গিয়ে একত্রে নামাজ আদায় করলে আল্লাহর আদেশ পালনের পাশাপাশি দিনে অন্ততঃ তিনবার কারখানার বিভিন্ন বিভাগে কর্মরতদের মাঝে সাক্ষাত এবং নিজেদের মধ্যে সৌহার্দ্য সম্পর্কের সৃষ্টি হওয়ার সুযোগ রয়েছে। অথচ কারখানার অনেক কর্মকর্তা নামাজের জন্য নির্দিষ্ট কক্ষে না গিয়ে নিজেদের ডেস্কে জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়েন। তাই নির্ধারিতস্থানে নামাজ আদায়ের চর্চার মাধ্যমে কারখানায় কর্মরতদের দুরত্ব কমিয়ে সৌহার্দ্য সম্পর্ক সৃষ্টি করার উপায় হিসেবে নির্ধারিত স্থানে নামাজ আদায়কে বাধ্যতামূলক করে কর্তৃপক্ষ এ আদেশ জারী করেছে। বিষয়টিকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখার কোন কারণ নেই।

কারখানার প্রোডাকশন ম্যানেজার ফারিন বলেন, রপ্তানী কারক এ কারখানায় কোন সাম্প্রদায়িকতা নেই। কারখানার সবাই নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করেন। বিচ্ছিন্নভাবে সময়ক্ষেপন না করে যেন কেউ কাজে ফাঁকি দিতে না পারে সেজন্য নামাজের বিষয়টিকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে এ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তবে এ নোটিশের প্রেক্ষিতে এখন পর্যন্ত কারখানার কোনো কর্মকর্তার বেতন কাটা হয়নি। এ কারখানায় গেঞ্জি কাপড়ের নানা ডিজাইনের পোশাক তৈরি হয়। কারখানার রপ্তানী পণ্যের পরিমান প্রতি মাসে ১৮ লাখ পিস। কারখানার উৎপাদিত পণ্য জাপান, রাশিয়া ও আমেরিকা অঞ্চলের বেশ কিছু দেশে রপ্তানী করা হয়। ২০১৬ সালে এ কারখানার রফতানি আয় ছিল ৯০ মিলিয়ন ডলার।

কারখানার ডাইং ও ফিনিশিং বিভাগের সিনিয়র ম্যানেজার দেবব্রত কুন্ডু এবং হিসাব বিভাগের নিরীক্ষক বিলাস রসকার বলেন, এ কারখানায় কর্মরত সবাই অসাম্প্রদায়িক পরিবেশেই কাজ করছে। সবাই স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্ম পালন করছে। এ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের কোনো ঘটনা ঘটে নি। কারখানার নির্ধারিত স্থানে গিয়ে অনেকে নামাজ পড়লেও কেউ কেউ নিজ ডেস্কে নামাজ আদায় করেন। তাই সকলকে একত্রে নামাজ আদায়ের জন্য এবং সময়ের প্রতি যতœশীল হতেই ওই নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

তবে এ ব্যাপারে কারখানার একাধিক শ্রমিক জানান, কারখানা কর্তৃপক্ষ কখনও শ্রমিকদের নামাজ পড়ার জন্য বা না পড়ার জন্য কোনো ধরনের চাপ প্রয়োগ করেন নি।