গাজীপুরে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ঝুকি বেড়েছে। রবিবার থেকে জেলার বিভিন্ন পোশাক কারখানা খুলে দেওয়ার ঘোষণায় করোনা ভাইরাস সংক্রমণের সম্ভবানাকে উপেক্ষা করে ওইসব কারখানার হাজার হাজার শ্রমিক গাজীপুরে ফিরতে শুরু করেছে। প্রথম দফায় ১০দিন ছুটি দেওয়া হলেও দ্বিতীয় দফায় ছুটি বাড়েনি। এতে শ্রমিকরা পড়েছেন বিপাকে। তাই করোনা আতংকের পাশাপাশি ছাটাইয়ের আশংকায় তারা চাকুরি রক্ষা করতে ছুটছেন কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে। শনিবার হতে বিভিন্ন জেলা থেকে দল বেঁধে শ্রমিকরা ছুটছে তাদের কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে। গণপরিবহন চলাচল বন্ধ থাকায় তারা পিকআপ, ট্রাক ও রিক্সায় চড়ে বাড়ি থেকে আসছেন। যানবাহন না পেয়ে অনেকে পায়ে হেটে ছুটছেন গন্তব্যের পথে। আবার অনেকে গাড়ি পাওয়ার আশায় বিভিন্ন ষ্ট্যান্ড ও পয়েন্টে জড়ো হয়ে অপেক্ষা করছেন। যানবাহন স্বল্পতার কারণে মানা হচ্ছে না করোনা সংক্রমণ রোধের কোন নিয়ম কানুন। এতে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস সংক্রমণের সম্ভবানা দেখা দিয়েছে।

গাজীপুরের গড়গড়িয়া মাষ্টারবাড়ি এলাকার মেঘনা নীট কম্পোজিট পোশাক কারখানার সহকারি মহাব্যবস্থাপক (মানব সম্পদ ও প্রশাসন) ইকবাল হোসেন জানান, বিশ^ ব্যাপী করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের পোশাক কারখানা বন্ধ থাকার নির্দেশণা নাই। তবে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকারের ভূমিকাকে সমর্থন জানিয়ে এ কারখানাসহ জেলার বেশ কিছু কারখানা বন্ধ রেখেছে কারখানা কর্তৃপক্ষ। এ কারখানায় তিনসহ¯্রাধিক শ্রমিক ও কর্মচারী কাজ করে। এ ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে গত ২৬ মার্চ থেকে ৪এপ্রিল পর্যন্ত কারখানাটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ৫ এপ্রিল (রবিবার) হতে কারখানাটি চালু হবে। ২৫ মার্চ ছুটির নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়াও মোবাইলে মেসেজ দেওয়া হয়। শ্রমিকদেরকে তাদের অবস্থান ত্যাগ না করে ঘরে অবস্থান করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু কিছু সংখ্যক শ্রমিক দীর্ঘ ছুটি পেয়ে গ্রামের বাড়ি গিয়েছে। যারা গ্রামের বাড়ি গিয়েছে তারা শনিবারের মধ্যে ফিরছে। ইতোমধ্যে করোনা ভাইরাস সম্পর্কে শ্রমিক কর্মচারীদের সচেতন করা হয়েছে। তাদের মাঝে মাস্ক, সেনিটাইজারসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী সরবরাহ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে কারখানা কর্তৃপক্ষ সচেতন রয়েছেন।

এদিকে শনিবার দুপুরে গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা, রাজেন্দ্রপুর চৌরাস্তা, মাওনা চৌরাস্তা সহ বিভিন্ন স্ট্যান্ডে ও পয়েন্টে গিয়ে দেখা গেছে গার্মেন্টস শ্রমিকদের ভীড়। টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, জামালপুর, শেরপুর অঞ্চলের গ্রামের বাড়ি থেকে সকাল হতেই পিকআপ, ট্রাক ও ভ্যান গাড়ীতে চড়ে গাজীপুর, নারায়নগঞ্জ ও রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার পোশাক কারখানার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। জেলার বিভিন্ন বিভিন্ন স্ট্যান্ডগুলোতে যানবাহনের আশায় অপেক্ষা করতে দেখা গেছে অগণিত নারী-পুরুষ শ্রমিককে। যানবাহন স্বল্পতার সুযোগে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছে পরিবহণ শ্রমিকরা। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের চেয়ে এসব পোশাক শ্রমিকদের কাছে তাদের চাকুরী রক্ষা করাটা বেশি প্রয়োজন বলে দাবী করছেন তারা। রবিবার থেকে তাদের পোশাক কারখানাগুলো খোলা হবে। কারখানা থেকে তাদেরকে ফোন দেয়া হয়েছে ৫ এপ্রিল কাজে যোগদান করার জন্য।

গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তার পিকাপভ্যান চালক আলমগীর বলেন, রাস্তায় পোশাক শ্রমিক ছাড়া কোনো যাত্রী নাই। শ্রমিকেরা দ্বিগুণ ভাড়ায়ও যেতে রাজী থাকে। আমরাও ঘর থেকে বেরিয়ে তাদের সেবা করতেই মুখে মাস্ক লাগিয়ে ঝুঁকি নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়ার চেষ্টা করছি। তবে বিপুল সংখ্যক লোকের সমাগমের কারণে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ঝুকি রয়েছে এ জেলায়।

ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার বড়পুটিয়া এলাকার আকরাম হোসেন গাজীপুর সদর উপজেলার বাঘেরবাজার এলাকার মন্ডল গার্মেন্টস লিমিটেডের সুইং অপারেটর। তিনি বলেন, বৃহষ্পতিবার তাকে অফিস থেকে ফোন দিয়ে ৫ এপ্রিল কাজে যোগাদান করতে বলেছেন কারখানা কর্তৃপক্ষ। সে অনুযায়ী শনিবার ভোর সাড়ে ৬টায় তিনি বাড়ি থেকে রওয়ানা হন। কোথাও তিনি যাত্রীবাহী বাসের দেখা পাননি। কখনও অটোরিক্সা, কখনও সিএনজিচালিত অটোরিক্সা আবার কখনও পায়ে হেঁটে দুপুর ২টার সময় মাওনা চৌরাস্তা এসে পৌঁছান। করোনা ভাইরাসের কারণে সরকারের লকডাউন ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ব্যাপারে তিনি বলেন, কারখানা খোলা থাকলে এ দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব নয়। কারখানার ভেতরেও এ দূরত্ব কতক্ষণ বজায় থাকবে ?

ময়মনসিংহের ফুলপুর এলাকার সোনিয়া গাজীপুরের একই পোশাক কারখানার সহকারী অপারেটর। তিনি বলেন, শনিবার সকাল সাড়ে সাতটায় স্বামী সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে মুখে মাস্ক লাগিয়ে বাড়ি থেকে রওয়ানা হন কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে। কোনো যানবাহন না পেয়ে প্রথমে পায়ে হেঁটে আবার রিক্সাযোগে এক হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে দুপুর আড়াইটায় মাওনা চৌরাস্তা এসে পৌঁছেন। ২’শ টাকা ভাড়ার জায়গায় পাঁচগুন বেশি ভাড়া দিয়ে কারখানায় যোগ দিতে যাচ্ছেন। মাওনা চৌরাস্তা থেকে মাঝে মধ্যে দু একটি পিক আপ ভ্যান ঢাকার দিতে দেখা যায়। সেগুলো বাস্ট্যান্ড থেকে যাত্রী উঠায় না। স্ট্যান্ড থেকে সামান্য আগে বা পেছন থেকে যাত্রী উঠিয়ে নিয়ে যায়। স্বামী সন্তান নিয়ে অনেক চেষ্টা করেও প্রতিযোগিতায় না পেরে কোনো যানবাহনে চড়তে পারিনি। একই কথা বলেছেন গাজীপুর সদর উপজেলার ইউটা গার্মেন্টেস লিমিটেডের সুইং অপারেটর জহুরা বেগম। তিনি শনিবার ভোর ৬টার দিকে নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া এলাকার গ্রামের বাড়ি থেকে রওয়ানা হন।

শেরপুরের শ্রীবর্দী উপজেলার শ্রমিক সুফিয়া খাতুন জানান, কারখানা খুলে গেছে তাই যাচ্ছি। আজ কারখানায় উপস্থিত না হতে পারলে যে কয়দিন ছুটি পাইছি সে কয়দিন অনুপস্থিত দেখাবে কর্তৃপক্ষ। যার কারণে অতিরিক্ত টাকা দিয়েই কারখানায় যাচ্ছি।

বিজিএমইএ’র ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, কারখানা বন্ধ রাখার কথাই ছিলনা। হঠাৎ করে একটা মিস আন্ডার স্ট্যান্ডিংয়ের মধ্য দিয়ে বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ কারখানা বন্ধ করার জন্য অনুরোধ করল। আর এ সুযোগেই শ্রমিকরাই নিজ নিজ এলাকা ছেড়ে তাদের গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন। তাদের তো যানবাহনে লকডাউনের মধ্যে গ্রামে যাওয়ার কথা নয়। সবাইতো কাজ করতেছে। ডাক্তাররা, সাংবাদিকরা, পুলিশরা তো কাজ করছেন। কারখানার আশে-পাশে থাকার চেয়ে গ্রামে গিয়ে থাকা কি বেশি নিরাপদ? তারা গ্রামে গেল কেন? যদি গ্রামে থাকাটা বেশি নিরাপদ হতো তাহলে ছুটি আরো বাড়িয়ে দিতাম। এমুহুর্তে দেশের তথা বিশ্বেও যে কন্ডিশন চলছে সেক্ষেত্রে আমাদের কারখানা চালানোর এবং রপ্তানীর ন্যূনতম সুযোগও যদি পাই সেটাকে কাজে লাগানো আমাদের জন্য খুব জরুরী। এমাসে আমাদের রেমিটেন্স কমে গেছে, আগামি মাসে আরো কমে যাবে। তাহলে দেশটা চলবে কিভাবে? দেশকে রক্ষা করতে এগিয়ে নিতে সবার সহযোগিতা দরকার। দেশের পোশাকপন্য রপ্তানী করা জরুরী। তা-না হলে অন্যরা এ সুযোগ কাজে লাগাবে। চীন কারোনা সংক্রমন হলেও চীন এখন সব কারখানা খুলে দিয়েছে।
প্রশ্ন আসতে পারে এরমধ্যে অসুস্থ হলে কি হবে? জীবনের কি হবে? আমেরিকা, ইংল্যান্ড, কানাডা, ইতালির মত দেশই করোনায় হিমশিম খাচ্ছে। আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করি যেন আমাদের দেশে ওই রকম না হয়। আমাদের সরকার অত্যন্ত সতর্ক। এজন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। এছাড়া আমাদের শ্রমিকরা কর্মঠ, ইয়ং তাদের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক স্ট্রং। বস্তিতে একটি ছোট ঘরে কয়েকজন থাকে। তাদের চেয়ে আমাদের শ্রমিকরা কারখানায় এবং ভালবাসায় অনেক পরিবেশে ভালভাবেই জীবন যাপন করেন। ভয় না করে নিয়ম মেনে চললে আমাদের কোন ক্ষতি হবেনা।

ছুটিতে যাওয়ার কারণে শ্রমিকরা ওই ক’দিনের বেতন পাবেন কি-না প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, কাজ না করে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পাওয়ার প্রশ্নই উঠে না।

গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু জানান, পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে এরকম ক্রাইসিস মুহুর্তে অনেক কারখানা মালিকরা শ্রমিক ছাটাই করে থাকে। চট্টগ্রামের কর্নফুলী ইপিজেড’র ইন্টিমেট এপারেলস কারখানার এক শ্রমিক তাকে জানিয়েছেন, কারখানা কতৃপক্ষ ইতোমধ্যে যেসব শ্রমিকদের চাকুরীর বয়স ৬মাসেরও কম তাদের নাকি ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা করছেন। শুধু তা-ই নয় শ্রমিকরা শ্রমঘন এলাকায় করোনা ভাইরাস থেকে কতটুকু নিরাপত্তা পাবে তানিয়েও আতঙ্কে আছেন তারা। যানবাহনের লকডাউন বাড়ালেও তাদের ছুটি বাড়েনি। ৪১লাখ শ্রমিকদের কারখানা কর্তৃপক্ষ কিভাবে করোনা সংক্রমনের নিরাপত্তা দেবেন? সামনে ঈদ শ্রমিকরা পুরো মাসের বেতন পাবে কি-না তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

বিজিএমইএ’র সভাপতি রুবানা হক বলেছেন, আমাদের শ্রমিকদের তো কারখানার আশেপাশেই থাকার কথা। তারা এখান থেকে গেল কিভাবে? অনেকে ছাটাই আতঙ্কে ভুগলেও ছাঁটাইয়ের কোন অবকাশ নেই। সে প্রত্যেককে বলা হয়েছে আপনারা ছাঁটাই করতে পারবেন না। এ মূুহুর্তে আমি শ্রমিকদের সেটাই আশ্বস্ত করছি। ছুটির ব্যাপারে তিনি বলেন, কারখানা তো বন্ধ করার কথা মিনিস্ট্রি বলে নি। আমি সরকারের সিদ্ধান্তের কথা বলেছিলাম, যাদের কাজ আছে তারা কারখানা চালাবেন। আমি তো সরকারের বাইরের কথা বলতে পারব না।

মাওনা হাইওয়ে থানার ওসি মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে ট্রাক পিকাপ চালকদেরকে বাধা দেয়া হচ্ছে। যাত্রীদেরকেও ওইসব পরিবহন থেকে নেমে যেতে বলা হচ্ছে। অনেকে দলবেঁধে পায়ে হেঁটে গাজীপুর মহানগর ও ঢাকা অভিমুখে চলছেন।

গাজীপুর শিল্প পুলিশের কাশিমপুর এলাকার ইন্সপেক্টর অপূর্ব বলেন, এ এলাকার বেশীরভাগ পোশাক কারখানা রবিবার হতে চালু হচ্ছে। কারখানা কর্তৃপক্ষ তাদের কারখানা চালু করলে আমাদের পক্ষ থেকে কোন বাধা নেই। তবে করোনা ভাইরাস সম্পর্কে সচেতন থেকে তাদেরকে সামাজিক দুরত্ব ও নিয়ম কানুন বজায় রাখার ব্যাপারে শিল্প পুলিশ কাজ করবে।

এ ব্যাপারে শ্রীপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফারজানা নাসরিন বলেন, সরকারি নির্দেশ অমান্য করে ট্রাক পিকাপে যাত্রী বহন করায় বেশ কয়েকজন ট্রাক চালককে অর্থ দন্ড ও তা আদায় করা হয়েছে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সরকারি নির্দেশ বাস্তবায়নেও তৎপর রয়েছে।