করোনাভাইরাস জনিত উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘমেয়াদী ছুটির ফলে প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানের জন্যেই কাজের গতি ফিরিয়ে আনা ও ক্ষতি পুষিয়ে আনা কঠিন হবে। এর জন্য চাই সঠিক পরিকল্পনা ও প্রয়োগের যথাযথ কৌশল বাস্তবায়ন করা। বিশেষ করে যারা বিক্রয় ও বিপণন পেশায় নিয়োজিত আছেন, তাঁদের জন্য বিষয়টি বেশ কঠিন এবং প্রতিযোগিতাপূর্ণ হবে। এখানে দীর্ঘমেয়াদী ছুটির ফলে কাজের গতি ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য বেশকিছু কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, যা একটি প্রতিষ্ঠানকে এবং প্রতিষ্ঠানে কর্মরত জনবলকে দ্রুত কাজের গতি ও ক্ষতি পুষিয়ে আনতে সাহায্য করবে।

🔹উপস্থিতি নিরূপণ(Determining Determining Attendance) :অফিসও মাঠ পর্যায়ে কর্মরত কর্মকর্তা/কর্মচারীদের উপস্হিতি নিয়মিত মনিটর করুন এবং কেউ অসুস্থ হলে বিকল্প জনবল প্রস্তুত রাখুন।সকলের শারীরিক,মানসিক,পারিবারিক ও আর্থিক অবস্হার নিয়মিত খোঁজখবর নিন এবং মনোবল ধরে রাখুন।প্রতিষ্ঠানের Logistics & অন্যান্য resources কোন অবস্হায় আছে সর্বদা দেখেনিন।

🔹সম্মিলিত চিন্তা ও কাজের সমন্বয় নির্ধারণ (Thinking together & working together) :সম্মিলিত চিন্তার পাশাপাশি সম্মিলিত ভাবে কাজ করুন। জুনিয়রদের মতামত শুনুন।তাদের কাছ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ আসতে পারে। সবাইকে নিয়ে সামনের দিনের কর্ম পরিকল্পনা ও কৌশলগত প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা করুন। এ নিয়ে প্রতিদিন গুরুত্বপূর্ণ জনবলের সমন্বয়ে মিটিং করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন।

🔹নতুন চিন্তাধারার প্রবর্তন(Introducing new thinking) :অপেক্ষাকৃত কার্যকরী New idea তৈরী করুন।কার্যকরী ফলাফলের জন্য অভিনব চিন্তা ও কাজের নতুনত্ব আপনাকে ফলাফলে অন্যদের থেকে এগিয়ে দিবে।

🔹ইতিবাচক মানসিকতা তৈরীকরা (Creating a positivemind set) : কঠোর পরিশ্রম এবং ভালো ফলাফলের জন্য সবার ইতিবাচক মানসিকতা তৈরী করুন।Positive attitude can make a great result.পরিশ্রমের পাশাপাশি সবার বিশ্রাম এবং আনন্দদায়ক কর্ম পরিবেশ নিশ্চিত করুন।

🔹স্বল্প মেয়াদী এবং দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা(Adopting Short term & Long term planning) :স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদী কৌশলগুলোর দু’টোই চিহ্নিত করুন।দুইটির প্রয়োগ ও ইতিবাচক ফলাফলের আগাম পার্থক্য নিরূপণের চেষ্টা করুন।সেই অনুযায়ী কর্ম পরিকল্পনা তৈরী করুন।

🔹কার্যকরী যোগাযোগ নির্ধারণ (Determining effective communication) :তৃণমূল পর্যায়ে সবার সাথে কার্যকরী যোগাযোগের উপায় বের করুন ও যোগাযোগ বৃদ্ধি করুন।তাদের প্রতিদিনের কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষন করুন।টার্গেট পূরণের জন্য ঘাটতি অর্জন নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা করুন। শতভাগ Target achievement এর জন্য প্রতিনিয়ত: প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দিন।

🔹কার্যকরীকৌশল প্রয়োগ নিশ্চিতকরণ(Ensuring the application of effective Strategies) :গৃহীত পরিকল্পনাসমূহের কৌশলগত সফল প্রয়োগ নিশ্চিত করুন। SWOT analysisকরুন (Strength, Weakness, Opportunity, Threat)।সমমান প্রতিযোগী অন্যান্য প্রতিষ্ঠান গুলোর কার্যক্রম সম্পর্কে সব সময় অবহিত থাকুন ও বিশেষ প্রমোশনালকার্যক্রম মোকাবিলার উপায় তৈরী করুন।

🔹পরিমান ও ফলাফলের পরিবর্তে কাজের মান নিশ্চিত করুন(Ensuring quality of work,instead of quantity & results) : দ্রুত ফলাফলের চাইতে কাজের মান বৃদ্ধির চেষ্টা করুন।তাড়াহুড়োর ফলে কাজে নেতিবাচক ফল আসতে পারে।কাজের মান Quantity &Result তৈরী করবে।

🔹কাজের মূল্যায়ন নির্ধারণ(Determining of work evaluation) :প্রত্যেকটিকাজের পরিকল্পনা,কাজের অগ্রগতি ও ফলাফল বিশ্লেষণ পূর্বক প্রতিদিন ফলোআপ নিশ্চিত করুন।ভুলগুলো দ্রুত শুধরে নিন এবং সমাধানের বিকল্প উপায়গুলো তৈরী করুন।

🔹পরিসংখ্যান বিশ্লেষণকরুন(Ensuring statistical analysis) : কাজের পরিসংখ্যান তৈরীকরুন ও বিশ্লেষণ করুন। সেই অনুযায়ী কর্ম পরিকল্পনা তৈরী করুন।পরিসংখ্যানআপনাকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে এবং কৌশল নিরূপন করতে সাহায্য করবে।

🔹ট্রেনিং সম্পাদন (Performing Training) :ভালো ফলাফলের জন্যসকলের দূর্বল দিক গুলো আলোচনা পূর্বকসক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সবাইকে সঠিক দিক নির্দেশনা প্রদান করুন।এজন্য সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে সরাসরি অথবা অনলাইনে ভিডিও কনফারেন্স এর মাধ্যমে সবাইকেট্রেনিং প্রদানের এর ব্যবস্হা গ্রহণ করুন।

🔹প্রচার, বিজ্ঞাপন,ডিজিটাল মার্কেটিং এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন(Publicity, Advertising, Digital marketing, Technological development) :পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভোক্তা ও গ্রাহকদের সাথে সরাসরি সংযোগের সম্ভাবনা কমে আসবে। পরিবর্তন আসবে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কার্যক্রমেও। এপরিস্থিতিতে পন্য বা যে কোন প্রচার কার্যক্রমের জন্য প্রিন্ট মিডিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়া, অনলাইন মিডিয়া, ডিজিটাল মার্কেটিং প্লাটফরমনিয়ে এখনইকার্যকরী পরিকল্পনা তৈরী করুন।

🔹ব্যয় সংকোচন করা (Ensuring expense reduction) : এই মুহূর্তে অহেতুক এবং অযৌক্তিক ব্যয়গুলো চিহ্নিত পূর্বক সেগুলি নিয়ন্ত্রণ করাটা খুবই জরুরী।

🔹দ্রুত অভিযোজন ক্ষমতা(Ability to adapt quickly) : যে কোন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজেদের দ্রুত খাপ খাইয়ে নেওয়ার মানসিকতা ও ক্ষমতাতৈরী করুন।

🔹সময় মতো পাওনা পরিশোধ করুন(Pay your dues in time) : কর্মীদের সময় মতো বেতনাদি ও অন্যান্য পাওনা পরিশোধ করুন।চাকুরীচ্যূত না করে, বেতনাদি বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কর্তন না করে ভালো ফলাফল তৈরী করার লক্ষ্যে কর্মীদের মানসিক ভাবে চাঙ্গা রাখুন।

🔹কর্মীদের স্বাস্থ্যগত সুরক্ষা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন (Ensure Health and Financial security) :কর্মীদের স্বাস্থ্যগত সুরক্ষা মেনে কর্ম পরিবেশ নিশ্চিত করুন। কাজ করতে যেয়ে কেউ অসুস্থ হলে কিংবা কারো মৃত্যূ হলে ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীর পরিবারের জন্য প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আর্থিক সাহায্যের নীতিমালা তৈরী করুন। এগুলি কর্মীদের মনোবল তৈরীর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি বৃদ্ধি করবে এবং ব্যবসার ভবিষ্যত ভিত্তিকে আরও সুদৃঢ় করবে।

🔹সকল ডিপার্টমেন্টের সাথে আন্ত: যোগাযোগ বৃদ্ধি করা (Increase interactions with all departments) : এই কঠিনসময়ে কোম্পানীর সকল ডিপার্টমেন্টকে এক সূত্রে গেঁথে সমস্যা মোকাবিলা এবং কার্যকরী সমাধানের জন্য একযোগে কাজ করুন। যেমন-হিসাব বিভাগ, অর্থ ব্যবস্থাপনা বিভাগ, প্রোডাকশন বিভাগ সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিভাগকে নিয়ে একসাথে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। এতে করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সহজ হওয়ার পাশাপাশি কাজে ভুলের পরিমানও কম হবে।

🔹প্রোডাকশন ডিপার্টমেন্ট কে শক্তিশালী রাখা(To keep the Production Department strong) : পন্যের স্বাভাবিক যোগান অব্যাহত রাখার জন্য প্রোডাকশন বিভাগের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই সকলকেই প্রোডাকশন বিভাগের সাথে সমন্বয় করে স্বাভাবিক উৎপাদন বজায় রাখতে হবে। টার্গেট, ডিমান্ড, অ্যাচিভমেন্ট ট্রেন্ড, SKU অনুযায়ী চাহিদা নিরূপণ ও বিশ্লেষণ পূর্বক বিক্রয়, বিপণন, সাপ্লাই চেইন, প্রকিউরমেন্ট ও প্রোডাকশন বিভাগকে এক যোগে কাজ করতে হবে।

🔹সাপ্লাই চেইন এবং প্রকিউরমেন্ট ডিপার্টমেন্ট কে শক্তিশালী রাখা (Strengthen Supply Chain & Procurement Department) : সাপ্লাই চেইন ডিপার্টমেন্টকে দিয়ে বাজারে পন্য উপস্থিতি ও আউটলেট কভারেজ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করুন।প্রকিউরমেন্ট ডিপার্টমেন্টকে কাঁচামাল যোগান ও গুনগত মান নিশ্চিত রাখার জন্য তৈরী থাকতে বলুন।

🔹চাপ সৃষ্টি না করে কাজের প্রেরণা প্রদান (Motivational Management, No stressed Management) :সবার উপর মানসিক চাপসৃষ্টিনা করে সহযোগিতা ও সহমর্মিতা প্রদান এবং সঠিক দিক-নির্দেশনার মাধ্যমেকাজের পরিবেশ ও অধিক ফলাফল তৈরী করার উপায় বের করুন।অত্যধিক মানসিক চাপ কর্মীদের মনোবল নষ্ট করেএবং তাদেরকে হতাশাগ্রস্ত করে তোলে।যা এই সময়ে নেতিবাচক ফলাফল তৈরী করতে পারে।

🔹বর্তমানওভবিষ্যতপরিস্থিতিনিয়েসতর্ক থাকা (Be aware of present and future situations) : করোনা ভাইরাসকে নিয়েই হয়তো আমাদের কাজ করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলা করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এই ধরণের পরিস্হিতি তৈরী হলে আগাম করণীয় কার্যক্রমও কৌশল সম্পর্কে সচেতন থাকুন এবং নিজেদের তৈরী রাখুন। কর্মী বাঁচলে প্রতিষ্ঠান বাঁচে, আবার প্রতিষ্ঠান টিকে থাকলে কর্মী টিকে থাকে।

🔹দূরদর্শী নেতৃত্বের প্রয়োজন (Visionary Leadership is needed) : এই ধরণের চরম খারাপ পরিস্থিতি উত্তরণের জন্য দূরদর্শী নেতৃত্বের ভূমিকাঅপরিসীম। কার্যকরী পরিকল্পনা, কৌশলগত সফল প্রয়োগ এবং দূরদর্শী নেতৃত্বই চরম এই দু:সময় পার করে প্রতিষ্ঠানকে উপহার দিতে পারে সুদৃঢ় অর্থনীতির আলোকিত একটি উঠোন।

পরিশেষে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার-করোনা ভাইরাসের কারণে পরিস্থিতিরকবে উন্নতি হবেবা আদৌ করোনা ভাইরাস পৃথিবী থেকে শতভাগ নির্মূল হবে কিনা-সেটা এখনই বলা মুশকিল।সেটাএকমাত্র মহান সৃষ্টিকর্তাই জানেন। তাই সব সময় স্বাস্থ্যবিধি মেনে কৌশলগত ভাবে আমাদের কাজ করে যেতে হবে এবং সকল সীমাবদ্ধতাকে শক্তিতে পরিণত করে সফলতা আনয়ন করতে হবে-এটাই এখনসময়ের দাবী।

লেখক :

মো: তবিবুর রহমান।
নির্বাহী পরিচালক, এফএমসিজি বিভাগ (বেসরকারী বিক্রয় এবং বিপণন প্রতিষ্ঠান)