লিবিয়ায় মানবপাচার ও পাচারের শিকার ২৬ বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় ৩৮ জনের বিরুদ্ধে ঢাকায় একটি মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি। গতকাল মঙ্গলবার রাতে সিআইডির এসআই রাশেদ ফজল বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করে পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু বকর সিদ্দিক জানান, মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে এবং হত্যার অভিযোগে মামলাটি করা হয়েছে। আসামি করা হয়েছে মোট ৩৮ জনকে।

মামলায় র‌্যাবের হাতে দুদিন আগে ঢাকায় গ্রেপ্তার কামাল হোসের ওরফে হাজী কামালকে (৫২) আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকার শহীদ তাজউদ্দিন সরণির ট্র্যাভেল এজেন্সি নাভীরা লিমিটেড ও হাতিরঝিলের ফ্লাইওভার ট্যুরস অ্যান্ড ট্র্যাভেলস লিমিটেডের মালিক দুই ভাই শেখ মো. মাহবুবুর রহমান (৪৯) ও শেখ সাহিদুর রহমান (৪০) এবং পুরানা পল্টনের স্কাই ভিউ টুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের মালিককে এ মামলায় আসামি করা হয়েছে।

এজাহারে ঢাকার কামরাঙ্গীর চরের কামাল হোসেন (৪২) ও শাহাদাত হোসেন নামের দুজনের নামও রয়েছে। আসামিদের তালিকায় আরও রয়েছে- কিশোরগঞ্জের ভৈরবের তানজিলুর ওরফে তানজিলুম ওরফে তানজিদ (৩৫), তানজিদের ভাতিজা নাজমুল (২৪), বাচ্চু ওরফে বাচ্চু মিলিটারি (৫৫), মো. জোবর আলী (৫৫), জাফর (৫৫), স্বপন, মিন্টু মিয়া (৩৫), হেলাল মিয়া (৪৫), হাজী শহীদ মিয়া (৬১), মো. খবির উদ্দিন, মুন্নি আক্তার রূপসী ও লালন। মামলার আসামিদের মধ্যে মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার জুলহাস সরদার (৪৫) ও সদর উপজেলার দিনা বেগম (২৫) ইতোমধ্যে স্থানীয় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন।

এ ছাড়া দিনার স্বামী নজরুল মোল্লা (৩৫), একই জেলার রাশিদা বেগম (৪২), বুলু বেগম (৩৮), আমির শেখ (৫৫), জাহিদুল শেখ (৩২), জাকির মাতুব্বর (৬০), আমির হোসেন (৫৫), নাসির, সজীব মিয়া, রেজাউল বয়াতী ও তিন ভাই নূর হোসেন শেখ (৪০), ইমাম হোসেন শেখ (৩৫) ও আকবর হোসেন শেখকে (৩২) আসামি করা হয়েছে সিআইডির মামলায়।

গোপালগঞ্জের লিয়াকত শেখ ওরফে লেকু শেখ (৪৫), আ. রব মোড়ল (৪০), কুদ্দুস বয়াতী, শরীয়তপুরের সাদ্দাম (৩৫), কুষ্টিয়ার আলী হোসেনও (৩০) এ মামলার আসামি। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ৩০ থেকে ৩৫ জনকে এজাহারে আসামি করা হয়েছে বলে জানান ওসি আবু বকর সিদ্দিক।

মামলার এজাহারে বলা হয়, ঢাকার বাংলামোটরের একটি ট্র্যাভেল এজেন্সির মালিকসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ট্র্যাভেল এজেন্সি ও রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক, কর্মচারী ও দালালরা ওই পাচারকারী চক্রে জড়িত। তারা ভালো বেতনের চাকরির ‘প্রলোভন দেখিয়ে’ বিভিন্ন অংকের টাকার বিনিময়ে ভিকটিমদের লিবিয়ায় পাচার করে কম টাকায় কঠিন শ্রমে নিয়োজিত করতো বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

সেখানে বলা হয়, লিবিয়ায় পাচারের পর বাংলাদেশি ওই দলটিকে এক জায়গায় জড়ো করে আটকে রাখা হয়। তারপর মিজদাহে ‘লিবিয়ানসন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সহযোগিতায় অপহরণের নাটক সাজিয়ে’ বাড়তি টাকা দাবি করা হয়। টাকা আদায়ের জন্য ভিকটিমদের ওপর নির্যাতন চালায় পাচারকারীরা। পরে সেই অডিও ও ছবি বাংলাদেশে স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় কোন এক সুদানি ভিকটিম আত্মরক্ষার জন্য একজন স্থানীয় মানবপাচারকারীকে হত্যা করে। পরে আসামিদের সহযোগিতায় স্থানীয় মানব পাচারকারীরা ভিকটিমদের গুলি করলে হতাহতের ঘটনা ঘটে বলা হয় মামলার এজাহারে।

উল্লেখ্য, গত ২৮ মে লিবিয়ার ত্রিপলি থেকে ১৮০ কিলোমিটার দক্ষিণের শহর মিজদাহে ২৬ বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যা করে একদল মানব পাচারকারী ও তাদের স্বজনরা। ওই ঘটনায় চার আফ্রিকান অভিবাসীও নিহত হন।

ওই ঘটনায় বেঁচে যাওয়া একজনের বরাতে সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, উন্নত জীবিকার সন্ধানে ইউরোপ যাওয়ার জন্য লিবিয়ায় দুর্গম পথ পাড়ি দিচ্ছিলেন ৩৮ বাংলাদেশি। বেনগাজি থেকে মরুভূমি পাড়ি দিয়ে মানবপাচারকারীরা তাদের ত্রিপোলি নিয়ে যাচ্ছিল। বৃহস্পতিবার ত্রিপলি থেকে ১৮০ কিলোমিটার দক্ষিণের শহর মিজদাহতে ওই দলটি লিবিয়ার মিলিশিয়া বাহিনীর হাতে জিম্মি হয়। তখন পাচারকারীরা আরও টাকা দাবি করে। এ নিয়ে বচসার মধ্যে আফ্রিকার মূল পাচারকারীকে মেরে ফেলা হলে তার পরিবার ও বাকি পাচারকারীরা এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে ৩০ জনকে হত্যা করে, আরও ১১ জন আহত হন।