কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান নিহতের একমাস পূর্ণ হয়েছে সোমবার (৩১ আগস্ট)। গত ৩১ জুলাই রাতে ঘটনাস্থলের কাছাকাছি থেকে সব প্রত্যক্ষ করেন টেকনাফের মরিচ বুনিয়ার একজন প্রত্যক্ষদর্শী। ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনার বর্ণনা দেন দিয়েছেন তিনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ৩১ জুলাই রাত নয়টার দিকে টেকনাফের মেরিন ড্রাইভ সড়কে এপিবিএনের চেকপোস্টে থামানো হয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদকে। তখন চেকপোস্টে এপিবিএনের পোশাকে ডিউটিতে ছিলেন একজন কনস্টেবল। তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে গাড়ি থামানোর দায়িত্বে ছিলেন। আর আগে থেকেই চেকপোস্টের কাছে সাদা পোশাকে উপস্থিত ছিলেন বাহারছড়া ক্যাম্পের ইনচার্জ ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলি ও এসআই নন্দলাল রক্ষিত।

এপিবিএনের ওই সদস্য চেকপোস্টে মেজর সিনহার সিলভার রঙের প্রাইভেট কারটি থামার সংকেত দেন। কারটি একটু এগিয়ে গিয়ে থামে। কাছে যান এপিবিএনের ওই সদস্য। পরিচয় জানতে চাইলে সিনহা নিজেকে সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর পরিচয় দেন। এসময় তিনি মেজর সিনহাকে চলে যেতে বলেন। হঠাৎই পরিদর্শক লিয়াকত দৌঁড়ে এসে গাড়ির চালকের আসনে থাকা ব্যক্তির পরিচয় জানতে চান। ইংরেজিতে নিজেকে সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা পরিচয় দেন মেজর সিনহা। এরপরপরই প্রাইভেটকার থেকে প্রথমে নামানো হয় সিনহার ভিডিও ধারণের সহযোগী সিফাতকে। সঙ্গে সঙ্গে তাকে থাপ্পড় দেওয়া হয় এবং জাপটে ধরে মাটিতে ফেলা দেওয়া হয়। যা করেন চেকপোস্টে থাকা এপিবিএনের সদস্যরা। এই ঘটনা দেখে সিনহা চালকের আসন থেকে দরজা খুলে বেরিয়ে আসেন।

এ সময় সিনহাকে হাত উঁচু করতে বলেই দূর থেকে পরপর দুটি গুলি করেন ইন্সপেক্টর লিয়াকত। সিনহার লাইসেন্স করা পিস্তল তখন গাড়িতেই ছিল। এরপর কাছে এসে আরো দুটি গুলি করেন পরিদর্শক লিয়াকত। এরপর সঙ্গে সঙ্গে মহাসড়কেই লুটিয়ে পড়েন মেজর সিনহা।

নিজের পরিচয় প্রকাশ পেলে তাকে পুলিশি হয়রারি করা হতে পারে বলে বারবার নিজের পরিচয় প্রকাশ না করতে অনুরোধ জানান এই প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি বলেন, সিনহা গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ওসিকে প্রথম ফোন দিয়ে জানান পরিদর্শক লিয়াকত। এর কিছু সময় পরেই পুলিশের গাড়িতে ঘটনাস্থলে আসেন ওসি প্রদীপ। তখন তিনি সাদা পোশাকেই ছিলেন। ঘটনাস্থলে এসে ওসি প্রদীপ সিফাতকে হ্যান্ডকাপ পড়াতে বলেন এবং নাকমুখ দিয়ে পানি ঢালতে থাকেন। এতে সিফাত ভীষণ চিৎকার করতে থাকে। হ্যান্ডকাপ না থাকায় প্রদীপ তার সঙ্গে থাকা পুলিশ সদস্যদের গালিগালাজ করতে থাকেন। বলেন, ‘দড়ি দিয়ে বাঁধ। নাকি সেটাও তোদের কাছে নেই?’ এসময় একজন এপিবিএন সদস্য দৌড়ে দড়ি খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। ততক্ষণে গুলির শব্দে আশপাশের আরো মানুষ চেকপোস্টের কাছে জড়ো হতে শুরু করে।

ওসি প্রদীপ এই প্রত্যক্ষদর্শীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ফেলেন। তবে স্থানীয় আরো মানুষ চেকপোস্টের দিকে এগিয়ে আসায় তিনি (ওসি) কিছু বলেননি।

ওই প্রত্যক্ষদর্শী আরো বলেন, শরীরে গুলিবিদ্ধ হয়ে মেজর সিনহা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কাতরাতে থাকেন। তখন ওসি প্রদীপ লিয়াকতকে কিছু একটা বলে সিনহার কাছে যান। প্রথমে বুকে পা দিয়ে পাড়া দেন এবং পা দিয়ে গলা চেপে ধরেন। তখনো নড়াচড়া করছিলেন সিনহা। এর কিছু সময় পরই নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায় তার। এসময় মেজর সিনহার দিকে তাকিয়ে অট্টহাসি দেন ওসি প্রদীপ। বেশকিছু সময় পুলিশের একজন এসআই একটি গাড়িতে করে মেজর সিহনাকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নেন বলেন প্রত্যক্ষদর্শী।

পরবর্তীতে এ ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে দুটি মামলা হয়। একটি মামলায় হয় টেকনাফ থানায়। এই মামলায় সরকারি কাজে বাধা ও গুলিতে নিহত হওয়ার অভিযোগ আনা হয়। সেই মামলার আসামি করা হয় সিফাতকে। আর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে রামু থানায় দায়ের করা মাদক মামলায় আসামি করা হয় শিপ্রা দেবনাথকে।

গত ৫ আগস্ট কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হত্যা মামলা করেন সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস। এতে টেকনাফ থানার বরখাস্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাসসহ ৯ পুলিশ সদস্যকে আসামি করা হয়। এ মামলায় এখন পর্যন্ত ওসি প্রদীপসহ সাত পুলিশ সদস্য, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) তিন সদস্য ও টেকনাফ থানা পুলিশের করা মামলার তিন সাক্ষীসহ ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব।

সিনহা হত্যা মামলায় ইতোমধ্যে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন গ্রেপ্তার এপিবিএনের তিন সদস্য, বরখাস্ত পুলিশ পরিদর্শক লিয়াকত আলী ও এসআই নন্দদুলাল।