চীন, জাপান, রাশিয়া এবং ভারতের সাথে মিয়ানমারের সম্পর্ক বেশ ভালো এবং অনেক পুরানোও বটে। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক জোট আসিয়ানের সদস্য মিয়ানমার। আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সাথেও মিয়ানমারের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ দুটি দেশ – চীন এবং রাশিয়া কখনোই মিয়ানমারের বিপক্ষে যায়নি।

যে কারণে ও রোহিঙ্গা সমস্যার কোন কুলকিনারা পায়নি বাংলাদেশ। বাংলাদেশ-মিয়ানমারের প্রতিবেশী পারমানবিক শক্তিধর তিন রাষ্ট্র চীন, ভারত আর রাশিয়া চাইলেই তো সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। জাতি সংঘ পর্যন্ত যাবার দরকার পড়ে না। এছাড়া আসিয়ানভূক্ত দেশগুলোও কোন ভূমিকা রাখছে না। সব কিছুর পেছনে বাণিজ্যিক স্বার্থ, এমন চিত্রই বিবিসি বাংলার বিশাল এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। যার উল্লেখযোগ্য অংশ তুলে ধরা হলো —

মিয়ানমারের কাছে চীনের ব্যাপক স্বার্থ- বিবিসি বাংলা ভাষ্য

চীনের সাথে মিয়ানমারের ব্যাপক অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং রাজনৈতিক সম্পর্ক আছে। আমেরিকার হার্ভার্ড ইন্টারন্যাশনাল রিভিউতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়েছে মিয়ানমারের উপর চীনের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক প্রভাব অনেক বেশি। মিয়ানমারে অবকাঠামো এবং জ্বালানি খাতে চীনের ব্যাপক বিনিয়োগ আছে। তাছাড়া চীনের বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হচ্ছে মিয়ানমার। দশকের পর দশক ধরে অর্থনৈতিক স্বার্থে চীন কখনো মিয়ানমারের সরকারের বিপক্ষে যেতে চায়নি। দেশটিতে যা কিছু ঘটুক না কেন বিনিয়োগ ও ব্যবসার স্বার্থে চীন সেগুলোর বিরুদ্ধে কোন কথা বলেনি।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, মিয়ানমারে সামরিক জান্তা ক্ষমতা নেবার পরবর্তী এক বছরে দেশটি ৩৮০ কোটি ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে ২৫০ কোটি ডলার ব্যয় করে একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস প্লান্ট করবে চীন। চীনের বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় রাখাইন রাজ্যের তেল ও গ্যাস ক্ষেত্র থেকে চীনের ইউনান প্রদেশে একটি জ্বালানি করিডোর স্থাপনের পরিকল্পনা আছে।

বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বিবিসি বাংলাকে বলেন, “আমেরিকার সাথে চীনের যদি কোন সংঘাত হয়, তাহলে তারা মালাক্কা প্রণালী বন্ধ করে দেবে। এটা চীন জানে। তখন তারা তেল ও গ্যাসের সরবরাহ কোথায় পাবে? চীন প্রচুর তেল-গ্যাস আমদানি করে। সেটা মিয়ানমার দিচ্ছে আকিয়াব বন্দরের মাধ্যমে। পাইপলাইনের মাধ্যমে চীন তেল-গ্যাস নিতে পারছে।” এসব কারণে মিয়ানমারের প্রতি চীনের সমর্থন এবং সহানুভূতি আছে বলে মি. কবির উল্লেখ করেন।

আসিয়ান জোট ও জাপানের সমর্থন- বিবিসি বাংলা তথ্য ও যুক্তি

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আসিয়ান জোট মিয়ানমারের বিরুদ্ধে শক্ত কোন অবস্থান নেয়নি। সেটিরও বড় কারণ ব্যবসায়িক বলে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। এই অঞ্চলে সবচেয়ে কার্যকরী অর্থনৈতিক জোট হচ্ছে আসিয়ান। আসিয়ানের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য রাষ্ট্র সিঙ্গাপুর মিয়ানমারে শীর্ষ বিনিয়োগকারী। তাদের অনুমোদিত বিনিয়োগরে পরিমাণ প্রায় ২৪০০ কোটি ডলার। অর্থাৎ মিয়ানমারে যত বিদেশি বিনিয়োগ আছে তার এক-চতুর্থাংশ হচ্ছে সিঙ্গাপুরের।

এছাড়া জাপান, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড এবং দক্ষিণ কোরিয়া থেকেও বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে বলে মিয়ানমার সরকারের বরাত দিয়ে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। যদিও সামরিক জান্তা ক্ষমতা নেবার পর বিদেশি বিনিয়োগ সার্বিকভাবে কমেছে। রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, মিয়ানমারের প্রতি জাপানেরও এক ধরনের সমর্থন আছে।

রাশিয়া সমর্থন দিয়েই যাচ্ছে- বিসিবি বাংলায় প্রকাশিত

জাতিসংঘের মিয়ানমার বিষয়ক মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ টমাস এন্ড্রুস সম্প্রতি বলেছেন, চীন এবং রাশিয়া মিয়ানমারের সামরিক সরকারকে অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করেছে। সাবেক মার্কিন কংগ্রেসম্যান টমাস এন্ড্রুস সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে বলেছেন, চীন এবং রাশিয়ার পাশাপাশি সার্বিয়াও মিয়ানমারের সামরিক সরকারকে অস্ত্র দিচ্ছে, যদিও তারা জানে যে এসব অস্ত্র বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে।

মিয়ানমারে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করার আহবান জানিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গত বছর একটি প্রস্তাব পাশ হয়েছে। চীন এবং রাশিয়া এ প্রস্তাবে ভোট দান থেকে বিরত ছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়নের একজন শীর্ষ কূটনীতিক জোসেপ বোরেল বলেছেন, মিয়ানমারের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে সেগুলো চীন এবং রাশিয়ার কারণে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

রোহিঙ্গাদের উপর নিপীড়ন নিয়ে বিভিন্ন দেশ যখন ব্যাপক সরব ছিল তখন মিয়ানমারকে নিয়ে চীন এবং রাশিয়া কোন উচ্চবাচ্য করেনি। বরং মিয়ানমারের সাথে এ দুটি দেশ বেশ সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে তারা কখনো মিয়ানমারের নিন্দা করেনি। রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, মিয়ানমারের সাথে রাশিয়ার সম্পর্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তৈরি হয়েছে। এর বড় কারণ হচ্ছে রাশিয়া মিয়ানমারের কাছে অস্ত্র বিক্রি করছে।

ভারতের স্বার্থ কোথায়? – বিসিবি বাংলা

ভারতের সাথে মিয়ানমারের প্রায় ১৬০০ কিলোমিটার স্থল সীমান্ত আছে। এছাড়া বঙ্গোবসাগরেও উভয় দেশের সীমান্ত রয়েছে। ভারত ও মিয়ানমার ১৯৫১ সালে একটি মৈত্রী চুক্তি করেছিল। রোহিঙ্গাদের উপর ব্যাপক নিপীড়ন হলেও ভারত কড়াভাবে সেটির নিন্দা করতে পারেনি। মিয়ানমারে বিভিন্ন সময় দমন-পীড়ন নিয়ে ভারত উদ্বেগ জানালেও তারা শক্ত অবস্থান নিতে পারেনি।

সংকটের শুরুর দিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যত প্রস্তাব এসেছিল সেগুলোতে ভোটদানে বিরত ছিল ভারত। ভারতের সাথে মিয়ানমারের বাণিজ্যিক সম্পর্কও আছে। অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি, জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে ভারতের বিনিয়োগ আছে মিয়ানমারে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, মিয়ানমারের জ্বালানি সম্পদ এবং বিভিন্ন বিরল প্রাকৃতিক পদার্থ ভারতের তথ্য প্রযুক্তি খাতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

তাছাড়া মিয়ানমারের ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মিয়ানমার হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগকারী। তাছাড়া ভারত থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা যাতে মিয়ানমারে গিয়ে আশ্রয় নিতে না পারে সেজন্য দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তিও রয়েছে। সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, ভারতের আশংকা চীনকে নিয়ে। চীন যদি মিয়ানমারে একক আধিপত্য পেয়ে যায় তাহলে মিয়ানমারকে ব্যবহার করে তারা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সমস্যা তৈরি করতে পারে। এই আশংকা থেকেই ভারত মিয়ানমারের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রেখে চলে বলে উল্লেখ করেন মি. কবির।

সূত্র : বিসিবি বাংলা