গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলায় অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জন করে শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচিত হয়েছেন মোসাঃ রাশিদা আক্তার। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ‘‘জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ-২০১৯’’ শীর্ষক কার্যক্রমের আওতায় তিনি শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচিত হন। তিনি কালীগঞ্জ পৌর এলাকার তুমুলিয়া গ্রামের মোঃ মোস্তফা মোল্লার স্ত্রী। সোমবার কালীগঞ্জ উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শাহানাজ আক্তার এ তথ্য জানিয়েছেন।

কালীগঞ্জ উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা শাহানাজ আক্তার জানান, উপজেলার নাগরী ইউনিয়নের গাড়ালিয়া গ্রামের হতদরিদ্র আবু ছাইদ ও খোদেজা খাতুন দম্পত্তির ৬ মেয়ে ও ৪ ছেলের সংসার। এই সংসারেরই ৩য় সন্তান হিসেবে বেড়ে ওঠা একজন হলেন রাশিদা আক্তার। মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও দশম শ্রেনীতে উত্তীর্ণ হওয়ার পর বেশী দিন পড়াশুনা করার সুযোগ হয়নি তার। তবুও রাশিদার চোখে ছিল হাজারো স্বপ্ন।
তিনি জানান, ‘কিছু করবার ভাবনা’ থেকে সুযোগ আসে পাশের গ্রামের বোয়ালখালী উচ্চ বিদ্যালয়ে টেইলারিং এর উপর প্রশিক্ষণের। সফলভাবে প্রশিক্ষণ গ্রহণ শেষ করে কষ্টের সঞ্চয় থেকে ক্রয় করেন একটি সেলাই মেশিন। শুরু হয় নতুন যুদ্ধ, নতুন পথচলা। ছোট্ট পরিসরে স্থানীয় মহিলা ও শিশুদের পোশাক সেলাই করে উপার্জন করতে থাকেন। স্বামীর উপার্জনের সঙ্গে মিলিয়ে সংসারে আসে একটু স্বস্তি। কিন্তু, বিধিবাম! স্বামীর শরীরে বাসা বাঁধে জন্ডিসের মারাত্মক প্রভাব। উপার্জন বন্ধ হয়ে যায় স্বামীর। একদিকে স্বামীর চিকিৎসার ব্যয়ভার ও সন্তানদের পরিচর্যা, অন্যদিকে অভাবের সংসার তো আছেই। এসব ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে ধীরে ধীরে স্বামীর ব্যবসায়ের পুঁজি শেষ হয়ে যায়। রাশিদার চারদিক যেন ঘোর অন্ধকারে ছেয়ে যায়। জোশ যার মননে, সাহস যার হৃদয়ে, সে কি ভেঙ্গে পড়ে? হাল ছাড়েননি তিনি। নতুন উদ্যোমে সংসারের হাল ধরে আবার যাত্রা শুরু করেন। স্বামীর ব্যবসাকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেন। নিজের প্রশিক্ষিত জ্ঞান, ব্যবসায়িক মনোভাব আর দারুণ কিছু করবার ভাবনা থেকে গড়ে তোলেন নতুন প্যাকেজিং ব্যবসা। মিষ্টির প্যাকেট, বিরিয়ানীর প্যাকেট, জুতার বাক্স ইত্যাদি তৈরী করতে থাকেন। ধীরে ধীরে লাভের মুখ দেখতে শুরু করেন রাশিদা। সংসারে আসে সুদিন। বর্তমানে প্যাকেট/প্যাকেজিং ব্যবসা করে মাসিক ২০ হাজার টাকা উপার্জন করছেন। এক ছেলে এবং এক মেয়েকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলেছেন রাশিদা। তার ছেলে মাস্টার্স পাশ করে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ এ কর্মরত আছে। মেয়ে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত।

নিজের সংসারের স্বচ্ছলতার তৃপ্তি আরো নতুন কিছু ভাবায়। সেই ভাবনা থেকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য ও কিছু করতে চান তিনি। প্রতিষ্ঠা করেন ‘নারী মুক্তি কল্যাণ সমিতি’। স্থানীয় নারীদের নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডে ভূমিকা রাখতে শুরু করেন। নিজ উদ্যোগে নারীদের সেলাই ও প্যাকেজিং এর প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য এলাকার মানুষদের নিয়ে বিভিন্ন উঠোন বৈঠকের মাধ্যমে যৌতুক, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে কাজ করতে থাকেন। নিজেকে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন সফল ও অনুকরণীয় একজন হিসেবে।