দেশের আয়করদাতাদের মধ্যে বড় একটি অংশ চাকরিজীবী। তবে করযোগ্য আয় থাকুক আর না–ই থাকুক নির্বাহী পর্যায়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের প্রতিবছর বার্ষিক আয়কর বিবরণী জমা দিতে হয়। আয়করের হিসাব-নিকাশ বেশ জটিল। এই কারণে অনেকেই সমস্যায় পড়েন। কেউ কেউ ঝক্কিঝামেলা থেকে মুক্তির জন্য উকিলের দ্বারস্থ হন। চলুন জেনে নিই চাকরিজীবী কীভাবে কর ঠিক করবেন, আর কাদের জন্য আয়কর প্রযোজ্য।

চাকরিজীবীদের মূল বেতন, চিকিৎসা ভাতা, বাড়িভাড়া, যাতায়াত সুবিধা, বছরে দুটি উৎসব বোনাস, ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার, গৃহ-সম্পত্তি, লভ্যাংশ ও ব্যাংক সুদ ইত্যাদিতে আলাদা হিসেব হবে। চিকিৎসা ভাতা হিসেবে মূল বেতনের ১০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় মিলবে। বাড়িভাড়াও চিকিৎসা ভাতার মতো। বার্ষিক আয় চার লাখ টাকার কম হলে এবং ৪০ লাখ টাকার কম সম্পদ থাকলে এক পৃষ্ঠার ফরম পূরণ করেই রিটার্ন জমা দেওয়া যাবে। তবে সিটি এলাকায় ফ্ল্যাট, বাড়ি কিংবা গাড়ি থাকলে এই সুবিধা পাবেন না। প্রথমবারের মতো এক পৃষ্ঠার ফরম চালু করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ৩০ নভেম্বরের মধ্যে এই এক পৃষ্ঠার ফরম পূরণ করে বার্ষিক আয়কর বিবরণী জমা দিলেই চলবে। এক পৃষ্ঠার ফরমে করদাতার ছবি, নাম, কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন), কর অঞ্চল ও সার্কেল, বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা দিতে হবে। এ ছাড়া করযোগ্য আয়ের পরিমাণ ও করের পরিমাণ লিখতে হবে।

জেনে নিন কারা আয়কর রিটার্ন দাখিল করবেন:

কোনো ব্যক্তি-করদাতার আয় যদি বছরে ৩ লাখ টাকার বেশি হয়; মহিলা এবং ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সের করদাতার আয় যদি বছরে সাড়ে ৩ লাখ টাকার বেশি হয় এবং গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা করদাতার আয় যদি বছরে ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকার বেশি হয়। এছাড়া যার ১২ ডিজিটের টিআইএন আছে, করদাতার মোট আয় করমুক্ত সীমা অতিক্রম করলে, আয় বছরের পূর্ববর্তী তিন বছরের যেকোনো বছর করদাতার কর নির্ধারণ হয়ে থাকলে, করদাতা যদি কোনো কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডারের এমপ্লয়ি বা কর্মচারী হন, করদাতা যদি কোনো ফার্মের অংশীদার হন, করদাতা সরকারের কোনো কর্তৃপক্ষ, করপোরেশন, সত্তা বা ইউনিটে বা প্রচলিত কোনো আইন, আদেশ বা দলিলের মাধ্যমে গঠিত কোনো কর্তৃপক্ষ, করপোরেশন, সত্তা বা ইউনিটের কর্মচারী হয়ে আয় বছরের যেকোনো সময় ১৬ হাজার টাকা বা এর বেশি মূল বেতন পান, যদি কোনো ব্যবসায় বা পেশায় নির্বাহী বা ব্যবস্থাপনা পদে বেতনভোগী কর্মী হন, আয়কর অব্যাহতি পাওয়া বা হ্রাসকৃত হারে করযোগ্য হয়ে থাকে, জিপ বা মাইক্রোবাস জাতীয় মোটর গাড়ির মালিক হলে, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ হতে ট্রেড লাইসেন্স গ্রহণ করে কোনো ব্যবসা বা পেশা পরিচালনা করলে, মূল্য সংযোজন কর আইনের অধীন নিবন্ধিত কোনো ক্লাবের সদস্যপদ থাকলে আয়কর দেয়া লাগবে।
এছাড়া চিকিৎসক, আইনজীবী, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্ট, প্রকৌশলী, স্থপতি অথবা সার্ভেয়ার হিসেবে বা সমজাতীয় পেশাজীবী হিসেবে কোনো স্বীকৃত পেশাজীবী সংস্থার নিবন্ধিত হলে, যদি আয়কর পেশাজীবী হিসেবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নিবন্ধিত হন, যদি কোনো বণিক বা শিল্পবিষয়ক চেম্বার বা ব্যবসায়িক সংঘ বা সংস্থার সদস্য হন, যদি কোনো পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের কোনো পদে বা সাংসদ পদে প্রার্থী হন, যদি কোনো সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা বা কোনো স্থানীয় সরকারের কোনো টেন্ডারে অংশগ্রহণ করেন, কোনো কোম্পানির বা কোনো গ্রুপ অব কোম্পানিজের পরিচালনা পর্ষদে থাকেন তাও আয়কর দেয়া লাগবে।

করদাতা যদি মোটরযান, স্পেস বা স্থান, বাসস্থান অথবা অন্যান্য সম্পদ সরবরাহের মাধ্যমে শেয়ারড ইকোনমিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেন, যদি লাইসেন্সধারী অস্ত্রের মালিক হন তাও আয়কর দেয়া লাগবে।
তবে বাংলাদেশে স্থায়ী ভিত্তি নেই এমন অনাবাসী এবং যারা কেবল জমি বিক্রি করতে বা ক্রেডিট কার্ড নিতে ১২ ডিজিটের টিআইএন নিয়েছেন, কিন্তু করযোগ্য আয় নেই, তাঁদের রিটার্ন দিতে হবে না।