19-01-15-President_Parliament-3

দৈনিকবার্তা-ঢাকা, ১৯ জানুয়ারি: গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার চ্যালেঞ্জ নিয়ে বর্তমান সরকার দেশ পরিচালনা করছে মন্তব্য করে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সরকার ও বিরোধী দলসহ সবাইকে জাতীয় সংসদে গঠনমূলক ও কার্যকর ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানিয়েছেন৷ জাতীয় সংসদ দেশের সকল কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু৷ এ প্রেক্ষাপটে আমি সরকারি দল ও বিরোধী দল নির্বিশেষে সকলকে জনগণের আকাক্ষা পূরণের প্রতিষ্ঠান জাতীয় সংসদে গঠনমূলক ও কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানাই৷

রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে সোমবার জাতীয় সংসদে দেওয়া ভাষণে আবদুল হামিদ এই আহ্বান জানান৷কোনও সংসদের প্রথম এবং নতুন বছরের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়ার বিধান রয়েছে৷ এর আগে গত বছরের ২৯ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির হিসেবে সংসদে প্রথম ভাষণ দেন আবদুল হামিদ৷বিকাল ৪টার কিছু আগে সংসদের উত্তর প্লাজা দিয়ে সংসদ ভবনে ঢোকেন রাষ্ট্রপতি৷ প্রেসিডেন্ট প্লাজা নামে পরিচিত এই স্থান থেকে সংসদে ঢোকার সময় সশস্ত্র বাহিনীর একটি বাদক দল বিউগল বাজিয়ে রাষ্ট্রপতিকে সম্ভাষণ জানান৷বিকাল সোয়া ৪টায় স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়৷ সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ উপস্থিত ছিলেন৷ সোয়া এক ঘন্টার বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি অর্থনীতি, বাণিজ্য, কৃষি, বিদ্যুত্‍, বৈদেশিক সম্পর্ক, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের কর্মকাণ্ড ও সাফল্য তুলে ধরেন৷ সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার বিভিন্ন দিকও তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি৷

রাষ্ট্রপতি বলেন, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সমুন্নত রেখে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার চ্যালেঞ্জ নিয়ে বর্তমান দেশ পরিচালনা করছে৷ গণতন্ত্রের বিকাশ, আইনের শাসন সুদৃঢ়করণ এবং সামাজিক শান্তি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সরকার দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে৷ গণতন্ত্রের ধারাবাহিক চর্চা ও অনুশীলন জাতির বিভিন্নমুখী সমস্যার সমাধান দিতে সক্ষম৷তিনি বলেন, দেশের মাটি থেকে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূল করতে বর্তমান সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ৷ বিগত মহাজোট সরকারের গৃহীত কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার এ লক্ষ্যে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যহত রেখেছে৷ এর ফলে দেশে নাশকতামূলক কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং জনজীবনে স্বস্তি ফিরে এসেছে৷”

মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার কাজ করছে বলেও ভাষণে উল্লেখ করেন আবদুল হামিদ৷বর্তমান সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্দোলনের নামে কতিপয় রাজনৈতিক দলের জ্বালাও- পোড়াও, ভাঙচুর, অগি্নসংযোগ, খুন-জখমসহ ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের মধ্যে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে৷

আবদুল হামিদ বলেন, বর্তমান সরকার একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে থেকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শণ, সমস্যা নিরসণে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন এবং জাতির অগ্রযাত্রার স্বপ্ন ও আকা্ঙ্খাকে বাস্তবে রূপ দিতে সর্বাত্মক উদ্যোগ নিয়েছে৷তিনি আরও বলেন, অতীতের অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতা কাটিয়ে উঠে ক্ষুধা-দারিদ্র ও শোষণ মুক্ত দেশ গড়তে মহাজোট সরকার গত মেয়াদে নিরন্তর প্রয়াস চালিয়েছে৷ তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার উন্নয়নের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে৷

দেশের সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও আর্থসামাজিক উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করতে সরকার আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছে৷ রাষ্ট্রপতি বলেন,গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান সমুন্নত এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারা অব্যাহত রেখে ২০১৪ সালে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে দশম জাতীয় সংসদ গঠিত হয় এবং বর্তমান সরকারের ওপর দেশ পরিচালনার গুরু দায়িত্ব অর্পিত হয়৷রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের গতি ত্বরানিত করতে সরকার আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছে৷ ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত গৌরবোজ্জ্বল স্বাধীনতা সমুন্নত এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুজ্জ্বল রাখতে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন সুদৃঢ় করতে এবং শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে, বাঙালি জাতিকে আবারও ইস্পাত কঠিন ঐক্য গড়ে তুলতে হবে৷

“ধর্ম-বর্ণ- গোত্র নির্বিশেষে এবং দল-মত-পথের পার্থক্য ভুলে জাতির গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার মাধ্যমেই আমরা লাখো শহীদের রক্তের ঋণ পরিশোধ করতে পারবো৷

সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সর্বাত্মক উদ্যোগ ও সুদৃঢ় পদক্ষেপ নিয়েছে মন্তব্য করে আবদুল হামিদ বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, জাতীয় চার নেতা হত্যার আপিল ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথাও তুলে ধরেন৷ সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে শোক প্রসত্মাব গ্রহণ এর আগে সংসদে কয়েকজন সাবেক সংসদ সদস্যসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মৃতু্যতে সর্বসম্মতিক্রমে শোক প্রসত্মাব গ্রহণ করা হয়েছে৷স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এ শোক প্রসত্মাব উত্থাপন করেন৷

যাদের নামে শোক প্রসত্মাব গ্রহণ করা হয়েছে তারা হলেন- সাবেক সংসদ সদস্য আলহাজ ফজলুল করিম, সরদার আমজাদ হোসেন, জামাল উদ্দিন আহমেদ ও প্রফুল্ল কুমার শীল৷এছাড়া বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি মোসত্মফা কামাল, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আনোয়ারুল ইকবাল, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলার ঐতিহাসিক রায় প্রদানকারী বিচারক কাজী গোলাম রসুল, খ্যাতিসম্পন্ন জেনোম বিজ্ঞানী অধ্যাপক মাকসুদুল আলম, মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রেরণাদানকারী বহু কালজয়ী গানের স্রষ্টা গোবিন্দ হালদার, বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও আনত্মর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ জগলুল আহমেদ চৌধুরী, মঞ্চ, টিভি ও চলচিচত্রের শক্তিমান অভিনয়শিল্পী খলিল উল্লাহ খান, চলচ্চিত্র পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম এবং শিশুসাহিত্যিক এখলাসউদ্দিন আহমেদ৷

পাশাপাশি দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন স্থানে দুর্ঘটনায় প্রাণহানিতে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়৷শোক প্রসত্মাবে মৃতু্যবরণকারীদের আত্মার মাগফেরাত ও শানত্মি কামনা এবং শোকসনত্মপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়৷পরে মৃতু্যবরণকারীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন ও তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে মোনাজাত করা হয়৷ মোনাজাত পরিচালনা করেন তরিকত ফেডারেশনের সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভান্ডারী৷

দশম জাতীয় সংসদের পঞ্চম অধিবেশন আগামী ৫ মার্চ পর্যনত্ম চালানোর সিদ্ধানত্ম নেয়া হয়েছে ৷সংসদ কার্য উপদেষ্টা কমিটির পঞ্চম সভায় এ সিদ্ধানত্ম নেয়া হয়৷সংসদ ভবনে কমিটির সভাপতি স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়৷ সভায় প্রয়োজনে অধিবেশনের এ সময়সীমা স্পিকার বাড়াতে বা কমাতে পারবেন বলেও সিদ্ধানত্ম নেয়া হয়৷কমিটির সদস্য সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সভায় অংশগ্রহণ করেন৷কমিটির সদস্য সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ, সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত, আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ, রাশেদ খান মেনন, চীফ হুইপ আ.স.ম. ফিরোজ এবং মইন উদ্দীন খান বাদল সভায় অংশগ্রহণ করেন৷সভায় প্রতি কার্যদিবসে অধিবেশন বিকেল সাড়ে ৪টায় শুরু করা সিদ্ধানত্ম নেয়া হয়৷ এছাড়া রাষ্ট্রপতির ভাষণ সম্পর্কে আনীত ধন্যবাদ প্রসত্মাবের উপর ৪৫ ঘন্টা আলোচনার সিদ্ধানত্ম নেয়া হয়৷সংসদের সিনিয়র সচিব মোঃ আশরাফুল মকবুল ও সংসদ সচিবালয়ের উধর্্বতন কর্মকর্তাগণ সভায় উপস্থিত ছিলেন৷এদিকে, সংসদের বৈঠক ২০ জানুয়ারি মঙ্গলবার বিকেল ৪টা ৩০ মিনিট পর্যনত্ম মুলতবি করা হয়েছে৷স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এ মুলতবি ঘোষণা করেন৷